তাসমিয়া তাবাসসুম ।।
যান্ত্রিক শহরের আনাচে কানাচে খুঁজে ফেরা কিছু স্বস্তির মাঝে দোল খেয়ে যায় টেবিলে শোভা পাওয়া ফুলদানিটা। সযতনে লিখে রাখে সহস্র ক্লান্তিভরা দিনলিপি। কাজের চাপে বেড়ে ওঠা তিরিক্ষি মেজাজে ঢেলে দেয় সুগভীর কোমলতা। অফিসের শুরুটা হয় যদি কিছু শুভ্র স্নিগ্ধ ফুলের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে, তবে সম্পূর্ণ কর্মদিবসটি ছেয়ে যাবে মোহনীয়তায়। প্রফুল্ল মনে সেরে নেয়া যাবে সমস্ত কাজের খুঁটিনাটি থেকে সম্পূর্ণটা।
গ্লাডিওলাস
গ্লাডিওলাস রজনীগন্ধার জাতভাই। তবে এর রঙের বিভিন্নতা সবার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। লম্বা স্টিকের ফুলের মধ্যে গ্লাডিওলাস অন্যতম সৌন্দর্যমন্ডিত একটি। যে কেউ এর রূপে বিমোহিত হতে বাধ্য।
ফুলের তোড়াতে সাদা, গোলাপি, লাল, বেগুনি বিভিন্ন রঙের গ্লাডিওলাসের সমারোহ দেখে মন মাতোয়ারা হয়। হোক প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আয়োজন, জন্মদিন কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠান, গ্লাডিওলাসে সাজানো তোড়া উপহার দেয়া এখন অনেকটা ট্রেডিশিনে পরিণত হয়েছে।
আমাদের দেশে দিনদিন গ্লাডিওলাসের চাহিদা বেড়েই চলেছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। ঢাকা, যশোর, কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি জেলায়। যেকোনো অনুষ্ঠানের স্টেজ বানাতে এখন ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন রঙের গ্লাডিওলাস। সভা-সমাবেশ, বিয়ে গায়ে হলুদ এমনকি বিয়ের গাড়ি সাজাতেও এর জুড়ি নেই। পহেলা বৈশাখ কিংবা ফাল্গুনের মেলায় দেখা যায় ললনাদের মাথা সেজে উঠেছে গ্লাডিওলাসের ক্রাউনে। বিদেশে রপ্তানির বাজারও বেশ রমরমা হয়ে উঠছে ইদানীং। ফুল ব্যবসায়ীরা বিশাল আগ্রহ নিয়েই যত্নের সাথে চাষ করছে গ্লাডিওলাস।
বাণিজ্যিকভাবে চাষ
গ্লাডিওলাস চাষ পদ্ধতি অনেকটা রজনীগন্ধা চাষের মতোই। করম ও করমেল থেকে চাষ করা হয় গ্লাডিওলাস।
জমি নির্বাচন
গ্লাডিওলাস চাষের জন্য আদ্র, উজ্জ্বল আলোকযুক্ত জমি নির্বাচন করতে হবে। জমি স্বাভাবিকের থেকে একটু উঁচু হলে সবচেয়ে ভালো হয়। কেননা উঁচু জমিতে পানি জমে থাকে না। অর্থাৎ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো এমন জমি গ্লাডিওলাস চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। বেলে দোঁ-আশ বা দো-ঁআশ মাটি মাটিতে চাষ করতে হবে গ্লাডিওলাস। কালো বা শক্ত ময়লাযুক্ত মাটিতে গ্লাডিওলাস ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারেনা। তাই বেলে দোঁ-আশ বা দোঁ-আশ মাটির জমি গ্লাডিওলাস চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
বেড তৈরি
গ্লাডিওলাস চাষের জন্য নির্বাচিত জমিকে খুব সতর্কতার সাথে ভালোভাবে চাষ দিয়ে তৈরি করতে হবে। যাতে জমির মাটি ঝুরঝুরে হয় ও সমান লেবেলে চলে আসে। গ্লাডিওলাস চাষের জন্য মাটি যত ভালোভাবে চাষ দেয়া হবে গাছ তত দ্রুত বৃদ্ধি পাবে ও ফুল ভালো আসবে। মাটি জৈবসার সমৃদ্ধ উর্বর মাটি নির্বাচন করতে হবে। মাটি কম উর্বর হলে গোবর ও জৈব পদার্থ মিশ্রনে মাটি তৈরি করতে হবে। মাটি তৈরির সময় বিঘা প্রতি ৪/৫ টন জৈবসার বা গোবর মেশাতে হবে। গ্লাডিওলাস চাষের জন্য আলাদা আলাদা বেড তৈরি করতে হবে। প্রতি বেডের প্রশস্ততা হবে ৬ ফুট। বেডের মাঝখান দুই থেকে তিন ফুট জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। যাতে গ্লাডিওলাসের পরিচর্যা ঠিকভাবে করা যায় ও ফুল কাটার সময় সহজে ফুল কাটা যায়।
করম রোপণ
বেড তৈরির সপ্তাহখানিক পরে কন্দ রোপণ করতে হবে। কন্দ রোপণের পূর্বে এর সুপ্তাবস্থা কাটাতে থায়ো ইউরিয়ার দ্রবণে আধাঘণ্টা সময় ধরে কন্দের গোড়ার অংশ ডুবিয়ে রাখতে হবে। এতে করে সুপ্তাবস্থার সময়সীমা কমে আসবে। মাঝারি বয়সের ও মাঝারি আকারের কন্দে ফুল ভালো ও দ্রুত আসে। সারিবদ্ধভাবে কন্দ রোপণের সময় এক সারি থেকে আরেক সারির দূরত্ব ১০ ইঞ্চি রাখতে হবে। আর কন্দ থেকে কন্দের দূরত্ব হবে ৬ ইঞ্চি। ৬ ইঞ্চি গভীর গর্ত করে কন্দ রোপণ করতে হবে।
পরিচর্যা
রজনীগন্ধা চাষের জন্য নিয়মিত পরিচর্যা খুবই জরুরি। নিয়মিত পানি সেচের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রতি সপ্তাহে একবার সেচ দিতে হবে। শীতকালে ৮/১০ দিন পরপর সেচ দেয়া ভালো। তখন মাটি বেশি আদ্র থাকে তাই। রজনীগন্ধার ক্ষেতে কোনোভাবেই আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবেনা। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। আগাছা পরিষ্কারের সময় অবশ্যই সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। যাতে কন্দের বা ফুলের কোনোপ্রকার ক্ষতি না হয়। ফলন ভালো ও দীর্ঘস্থায়ী করতে নিয়মিত মাটিতে নিড়ানি করা আবশ্যক। এতে মাটির আর্দ্রতা বাড়ে ও আলোবাতাস পানি সহজেই গাছ শোষণ করে দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে।
ফুলের স্বর্গে নিজেকে হারিয়ে খুঁজে ফিরি স্বপ্নজালের মায়ায়। কিন্তু আমাদের একটু ইচ্ছার সাথে খানিক পরিচর্যার সংমিশ্রণ গড়ে তুলতে পারে টুকরো টুকরো মায়ারাজ্য। পৃথিবীর বুকেই নিজের পাশে বেড়ে উঠতে পারে ছোট্ট একটা অপার্থিব জগত। যেখানে চোখ বোলালেই মিলবে শান্তির পরশ।
Photo by monicore
