তাসমিয়া তাবাসসুম ।।
ছোট কিংবা বড়, শিশু থেকে প্রবীণ আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব সম্মান আছে। স্ব-শ্রদ্ধা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে চিন্তাভাবনা তৈরি করে এবং প্রায় সব কিছুতে ভূমিকা পালন করে। সুস্থ ও কার্যকর আত্মসম্মান থাকা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আপনাকে আপনার দৈনন্দিন জীবনের ইতিবাচক পছন্দগুলি নির্ধারণ করতে সহায়তা করে। আপনার আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করবে। আপনাকে আপনার নিজের ব্যক্তিত্ব গড়তে সাহস দেয়, কঠিন মুহূর্তগুলোর সিদ্ধান্ত নিতে এবং সহায়তা করে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে।
আত্মবিশ্বাস এমন কোনো বিষয় নয় যা নিয়মের গণ্ডিতে ফেলে শিখে নেয়া যায়। আত্মবিশ্বাস মনের একটি অনুভূতির রাজ্য। যা ইতিবাচক চিন্তাভাবনা, অনুশীলন, প্রশিক্ষণ, জ্ঞান এবং অন্যান্য মানুষের সাথে কথা বলা, আচার ব্যবহারে আপনার মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।
আত্মবিশ্বাস মনের ও শরীরের সুস্থতার অনুভূতি ও মনের স্বীকৃতি। যা আপনার নিজস্ব দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার বিশ্বাস থেকে আসে। আত্মবিশ্বাস এমন একটি বৈশিষ্ট্য যেটি অধিকাংশ মানুষ ভোগ করতে চায়।
আত্মবিশ্বাস কি?
যদিও আত্মবিশ্বাসের অর্থ বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে বিভিন্নরকম হতে পারে কিন্তু বাস্তবিকই এটি কেবল নিজের উপর বিশ্বাস থাকার অর্থ প্রকাশ করে।
আমাদের মস্তিষ্কের কিছু অংশে, আমরা কীভাবে বেড়ে উঠেছি এবং কীভাবে আমাদের কোন জিনিসগুলো শেখানো হয়েছে। আমরা অন্যদের কাছ থেকে যে আচরণ শিখি সে সম্পর্কে চিন্তা করা, শেখা জিনিসগুলো সমাজে অন্যদের সামনে প্রতিফলিত করার যে মনোভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো নিজের মধ্যে ধারণ করার চিন্তাশক্তিই হলো আত্মবিশ্বাস। এছাড়াও বলা যেতে পারে আত্মবিশ্বাস আমাদের অভিজ্ঞতার একটি ফলাফল এবং কিভাবে আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আমাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি সেটির বিশ্বাস।
আত্মবিশ্বাস একটি স্ট্যাটিক পরিমাপ নয়। ভূমিকা ও কাজ সম্পাদন এবং পরিস্থিতিকে মোকাবেলা আমাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং হ্রাস করতে পারে। নিজেদেরকে দৈনন্দিন চিন্তাশক্তি কাজের প্রতিফলনের ওপর নির্ভর করে অন্যদের তুলনায় আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হতে পারে।
আত্মবিশ্বাস কেন জরুরি?
কম আত্মবিশ্বাস আপনার মানসিক স্বাস্থ্য, আপনার চেহারা এমনকি আপনার ভবিষ্যতের উপর আপনার নিজস্ব সিদ্ধান্তে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। আপনি একটি বিষয় যেভাবে দেখেন তার প্রতিটি অংশ পছন্দ করা সহজ নয়, তবে নেতিবাচক বিষয়গুলোতে আটকে থাকা সত্যিই আপনার আত্মবিশ্বাসকে কমিয়ে আনতে পারে। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি হলে জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়। সুখানুভূতির সাফল্যগুলো রয়ে যায় ধরা ছোয়াঁর বাইরেই। হেনস্থা হতে হয় সমাজের অন্যদের কাছে।
আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়
নিজের প্রতি বিশ্বাস যত দৃঢ় হবে জীবনে তত বেশি সাফল্যের জয়গাঁথা আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। অনেকেই সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার ক্ষমতা নিজের মধ্যে ধারণ করে থাকে কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব তা ধূলিসাৎ করে দেয়। নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস যত কমতে থাকবে সমাজ থেকে নিজেকে তত আলাদা মনে হবে। সবার মধ্যে থেকেও নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রবণতা বেড়ে যাবে। আত্মবিশ্বাস যাতে না কমে বাড়তে থাকে সেজন্য কিছু জ্ঞানচর্চা ও অনুশীলন লক্ষ্য করা যায়।
আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রকে দুইটি অংশে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে অবশ্যই নির্ধারিত কোনো না কোনো অভীষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। আর অন্যপক্ষটি হলো আপনার জ্ঞান ও দক্ষতা, যা ভেতর থেকে আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। কিছু পরামর্শ মেনে চলতে পারলে আপনার আত্মবিশাসের মাত্রা অনেকাংশে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি
মানুষ প্রায়ই নতুন বা সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি সম্পর্কে কম আত্মবিশ্বাস বোধ করে থাকে। সম্ভবত আত্মবিশ্বাস উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বা বিষয় হলো পরিকল্পনা এবং অজানা পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
আপনি যদি একটি নতুন চাকরির জন্য আবেদন করেন, উদাহরণস্বরূপ বলা যায় প্রথমে সাক্ষাতকারের জন্য ভেতর থেকে নিজেকে প্রস্তুত হতে হবে। আপনি যা বলতে চান তা পরিকল্পনা করুন এবং আপনার জিজ্ঞাসা করা কিছু প্রশ্নের বিষয়ে মনোযোগের সাথে চিন্তা করুন। বন্ধুদের বা সহকর্মীদের সাথে আপনার উত্তর অনুশীলন করুন এবং তাদের প্রতিক্রিয়া জানুন।
যেকোনো কাজের ক্ষেত্রেই পরিকল্পনা করা ও সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ আপনার আত্মবিশ্বাসের গন্ডি বাড়িয়ে দিবে।
শিক্ষা, জ্ঞান এবং প্রশিক্ষণ
যেকোনো বিষয়ে লব্ধ শিক্ষা, গবেষণা আমাদের কার্যপরিধির পরিস্থিতি, ভূমিকা এবং পরিচালনা করার দক্ষতার বিষয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে।
কী আশা করা উচিত, কীভাবে এবং কেন কাজ করা হয় তা জানার জন্য আপনার সচেতনতার হার বৃদ্ধি করতে হবে। এতে আপনি আরও প্রস্তুত এবং শেষ পর্যন্ত আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন।
জ্ঞান শেখা এবং অর্জন করার মাধ্যমে লাক্ষ্যিক কাজগুলো সম্পাদন করার জন্য আপনার ক্ষমতার প্রতি কম আস্থা বোধ করতে পারেন। যখন এটি ঘটে তখন আপনার অর্জিত জ্ঞানকে অভিজ্ঞতার সাথে একত্রিত করতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে বা নিজস্ব উদ্যোগে যেকোনো বিষয়ের নতুন সিস্টেম এবং পদ্ধতিগুলো পরিচালনা করার জন্য বা কীভাবে পরিচালনা করতে হয় তা শেখার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা যেতে পারে। যার ফলে নিজের মধ্যে আরও বেশি আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।
ইতিবাচক চিন্তা
ইতিবাচক চিন্তা আপনার আত্মবিশ্বাস উন্নতির একটি খুব শক্তিশালী উপায় হতে পারে। যদি আপনি বিশ্বাস করেন যে আপনি যেকোনো কিছু অর্জন করতে পারেন তবে আপনার সেই অর্জনের পেছনে সময় ও শ্রমের সাথে জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের সংমিশ্রণ ঘটানোর মনোভাব থাকতে হবে। প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ হতে পারে এমন নেতিবাচক মনোভাব দূরে সরিয়ে দিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে। আপনার পছন্দ করা প্রক্রিয়াটি আপনাকে বিশ্বাস করে যে আপনি কিছু করতে পারেন- সঠিক সহায়তা, পরিচালনা, প্রস্তুতি এবং জ্ঞান দিয়ে।
অন্যদের সাথে কথা বলা এবং তাদের নেতৃত্ব অনুসরণ
আপনার পছন্দের একজন সফল আত্মবিশ্বাসী মডেল খুঁজে নিন।আদর্শগতভাবে এমন মানুষ হবে যাকে আপনি নিয়মিত দেখেন ও কথা বলেন যেমন- হতে পারে আপনার সহকর্মী, পরিবারের সদস্য বা বন্ধু- যে কেউ, যাকে আপনি নিজের সামনে আয়না করতে চান আত্মবিশ্বাসের সাথে। এরপর তাদের পর্যবেক্ষণ করুন এবং তাদের আত্মবিশ্বাসী আচরণ লক্ষ্য করুন। তাদের সাথে কথা বলুন, তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করুন। এতে আপনার মাঝে আত্মবিশ্বাসী হবার প্রবণতা বেড়ে উঠবে।
শান্ত থাকা
নিজেকে যেকোনো কঠিন মুহূর্তেও শান্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। ধৈর্য মানুষের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মন যতটা স্থিতিশীল ও শান্ত থাকবে আপনি তত বেশি কাজে মনযোগী হতে পারবেন এবং দ্রুতই আপনার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে।
অহংকার দমন
অহংকার মানুষের সব ধরনের ভালো কাজ ও চিন্তাগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। সবার সাথে সহজেই মিশতে পারে না অহংকারী মানুষগুলো। এটি একটি রোগের মতো সংক্রামিত হতে থাকে সমগ্র জীবনের পরতে পরতে। যার ফলে কমে যেতে থাকে আত্মবিশ্বাস। তাই নিজের মধ্য থেকে অহংকারের বীজ সমূলে উৎপাটন করতে হবে।
একজন মানুষের নিজের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস থাকা খুবই জরুরি। নিজের প্রতি বিশ্বাস কমতে থাকলে একটা সময় সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হবে নিজেকে। সবকাজের ফলাফলে ব্যর্থতা জেঁকে বসবে তার আকাশচুম্বী অস্তিত্ব নিয়ে। তাই আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে যাতে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মনে হয় সুন্দর ও মনোরম। বেঁচে থাকার মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে নৈসর্গিক আনন্দ।




