শোলা লাওয়াল, আলজাজিরা ||
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতের একটি অংশ বরং লাভবান হচ্ছে-কয়লা শিল্প।
দক্ষিণ আফ্রিকার থার্মাল কয়লা উৎপাদক Thungela Resources জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশ বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বেশি করে কয়লা কিনতে শুরু করায় এর চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে।
কয়লা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং উৎপাদন খরচও কম। তবে এটি সবচেয়ে দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানিগুলোর একটি। কয়লা উত্তোলনে পানিদূষণ হয়, আর কয়লা পোড়ালে বিপুল পরিমাণ কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায়।
এরপরও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশেষ করে এশিয়ার কয়েকটি দেশ কয়লার ব্যবহার কমানোর আগের প্রতিশ্রুতি স্থগিত বা পিছিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কয়লার ওপর নির্ভরতা আবারও বাড়ছে।
কেন কয়লার ব্যবহার বাড়ছে?
ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে একটি বড় জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলা শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চললেও এর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমেছে এবং তেলের দাম বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু রাখতে অনেক দেশ সহজলভ্য বিকল্প হিসেবে কয়লার দিকে ঝুঁকেছে।
কয়লার দামও বেড়েছে, কিন্তু তেলের তুলনায় এটি এখনও অনেক সস্তা এবং অনেক ক্ষেত্রেই সহজে পাওয়া যাচ্ছে।
এই সংকটে এশিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ এশিয়ার বহু দেশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাসের প্রায় ৮২ শতাংশই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেত। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল প্রধান গন্তব্য।
যুদ্ধের কারণে শুধু রপ্তানি ব্যাহত হয়নি, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে। কাতার মার্চ মাসে তাদের জ্বালানি সরবরাহ চুক্তির ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। কারণ ইরানি ড্রোন হামলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় LNG কমপ্লেক্স রাস লাফান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়। কাতারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় দেশটির LNG রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাস আইল্যান্ড LNG টার্মিনাল, ফুজাইরাহ তেল টার্মিনাল ও রুয়াইস রিফাইনারি কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলা হয়েছে। সৌদি আরব ও ওমানের জ্বালানি অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কোন কোন দেশে কয়লার ব্যবহার বেড়েছে?
জ্বালানি বিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান Ember-এর হিসাবে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে কয়লার উৎপাদন ২০২৫ সালের তুলনায় ১.৮ শতাংশ বাড়তে পারে।
যে সময়ে বিশ্ব কয়লা থেকে সরে আসার কথা বলছে, সেই সময়ে এই বৃদ্ধি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
যুদ্ধ শুরুর পর এশিয়ার কয়েকটি দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
- জাপান পুরোনো ও বেশি দূষণকারী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে।
- দক্ষিণ কোরিয়া ২০৪০ সালের মধ্যে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়েছে।
- বাংলাদেশে শুরুতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য লোডশেডিং, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং যানবাহনের জন্য জ্বালানি বিক্রিতে রেশনিংয়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়।
- থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে।
- পাকিস্তানে আমদানি করা কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জুলাই পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে।
চীন ও ভারত একাই বিশ্বের মোট কয়লা ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে তারা বড় কয়লা উৎপাদকও।
ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, যার একটি কারণ তীব্রতর তাপপ্রবাহ। এই পরিস্থিতিতে দেশটি নতুন কয়েকটি কয়লাখনি প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা করছে। এতে বৈশ্বিক কয়লা সরবরাহ বছরে প্রায় ২৫০ কোটি টন বাড়তে পারে বলে Global Energy Monitor-এর হিসাব।
ইউরোপেও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি জলবায়ু প্রতিশ্রুতির ওপর চাপ তৈরি করছে। জার্মানি জানিয়েছে, আগের জলবায়ু প্রতিশ্রুতির কারণে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন ঝুঁকিতে ফেলবে না। ইতালি তাদের কয়লা-নির্ভরতা শেষ করার সময়সীমা ২০২৫ সালের শেষ থেকে পিছিয়ে ২০৩৮ সাল করেছে।
কারা কয়লা থেকে লাভ করছে?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া। এরপর রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া।
কয়লার দাম বাড়ার সুযোগ কাজে লাগাতে ইন্দোনেশিয়া মার্চ মাসে উৎপাদন কমিয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের আগের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। জুলাইয়ে কয়লার দাম প্রতি টন ১৩১.৮৫ ডলারে পৌঁছায়, যেখানে এক বছর আগে তা ছিল ১০২.২০ ডলার।
দক্ষিণ আফ্রিকার Thungela Resources-ও এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের লাভ করেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তাদের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত Ensham খনিতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া—দুই বাজারেই কয়লার চাহিদা ও দাম বেড়ে যাওয়া।
যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র সময়েই Ensham খনির উৎপাদন ৩৮ শতাংশ বেড়ে ২.২ মিলিয়ন টনে দাঁড়ায়। আগের একই সময়ে উৎপাদন ছিল ১.৬ মিলিয়ন টন।
কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি হেডলাইন আর্নিংস বা HEPS—দক্ষিণ আফ্রিকায় মুনাফা পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক—জুন পর্যন্ত বেড়ে ৪.৮০ দক্ষিণ আফ্রিকান র্যান্ড হয়েছে। এক বছর আগে এটি ছিল ১.৯২ র্যান্ড।
Thungela-এর ধারণা, ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো শীত মৌসুমের জন্য জ্বালানি মজুত করতে শুরু করায় কয়লার দাম আরও কিছুদিন উঁচু থাকতে পারে।
এতে কি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হবে?
২০২১ সালে COP26 জলবায়ু সম্মেলনে ৪০টির বেশি দেশ কয়লার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামও ছিল। তবে ভারত ও চীন ওই প্রতিশ্রুতিতে যোগ দেয়নি।
পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ কোরিয়াও Powering Past Coal Alliance-এ যোগ দেয়। এই জোটের লক্ষ্য হলো কয়লার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলোকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে নিয়ে যাওয়া।
কিন্তু বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই অগ্রযাত্রাকে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে। কারণ অনেক দেশের কাছে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করার মতো পর্যাপ্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নেই।
দক্ষিণ আফ্রিকার Zero Carbon Analytics-এর জ্বালানি রূপান্তর বিশ্লেষক নিক হেডলি বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে কয়লার ব্যবহার বাড়ানো তুলনামূলক সহজ। কারণ গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ করেছে এবং এর একটি বড় অংশ এতদিন অব্যবহৃত ছিল।
গ্যাসের দাম যখন বেড়ে যায়, তখন আমদানি করা গ্যাসের তুলনায় কয়লা সস্তা হয়ে পড়ে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কয়লা এখনও পিছিয়ে।
তবু পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। ইউরোপের মতো কিছু অঞ্চলে কয়লার ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে কমছে, যা অন্য জায়গার সাময়িক বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা পুষিয়ে দিচ্ছে।
চীনেও এ বছর কয়লার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমেছে। মে মাসে লিউশেনইউ কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৮২ জন নিহত হওয়ার পর দেশটির সরকার খনি খাতে নজরদারি আরও কঠোর করেছে। একই সঙ্গে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগও অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা যেভাবে সংকটের মুখে পড়েছে, সেটি উল্টো পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের এমন সংকট থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে দেশগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে বাধ্য করতে পারে।
নিক হেডলির মতে, এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-এশিয়ার দেশগুলোকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নের দিকে আরও দ্রুত এগোতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
