নয়ন আসাদ ।।
প্রবাহিণী যমুনার নিত্য ভাঙ্গা গড়ায়,
স্থান বদলানো ফেরীঘাট, যাত্রীদের অপেক্ষায়,
জলযান তিতুমীর, বাহাদুর শাহ, ঈশা খাঁ তুলত মৃদু গর্জন!
রক্তে গতি তুলত স্রোতের শব্দ, নদী, নীলাভ গগণ!
নদীর অদূরে থামা রেলগাড়ি,
যাত্রীদের উঠা নামার হুড়োহুড়ি,
কুলিদের হাঁক, দুপাশে অস্থায়ী দোকান থেকে,
সদ্য তুলে আনা মাছের তরকারি!
জাগিয়ে তুলত পেটের খিদে,
থমকে যেত দিদ্বিদিক ছুটে চলা মানুষ, যেন ভীষণ তাগিদে।
ঝিমিয়ে পড়া ঘাটে হঠাৎ গতি আনত প্রাণে,
তিস্তা ও একতার হুইসেল। কখনো গতি ফিরত স্টিমারের সাইরেনে,
পানিফল, শাপলা শালুক হাতে,
ছোট্ট কিশোরী, ডালা নিয়ে পান-বিড়ির দোকানী, ছুটত রাত-বিরাতে,
সন্ধ্যার আযানে এই ঘাটের কাউকে বাড়ি ফিরতে হত না!
বাহাদুরাবাদ ঘাট! হারিয়ে গেছে, যেন হারিয়ে গেছে যমুনার এক গহনা!
বাহাদুরাবাদ ঘাটে এমনই বিস্মৃত দিন এখন শুধুই স্মৃতি। ঘাটের প্রয়োজনীয়তা, জনপ্রিয়তা আর উপযোগীতা হারিয়েছে অনেক আগেই। সাম্প্রতিককালে নির্মিত বিশালাকার কোলাহলহীন ঘাট জানান দিচ্ছে শুধুই হাহাকার। অথচ আমাদের ছিল একটি বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু এখন যমুনার নিত্য ভাঙ্গা গড়ার খেলায় এক অভাগীনি উপজেলা দেওয়ানগঞ্জ। যার ঘাড়ের কাছে যমুনা প্রতিনিয়ত ফেলছে ভাঙ্গনের নি:শ্বাস! যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ও শিক্ষায় যোজন যোজন পিছিয়ে থেকে বলতে পারি শুধু স্বপ্নের কথা, থমকে যাওয়া সম্ভাবনার কথা। যমুনা, ব্রক্ষপুত্র, জিনজিরাম, দশানী প্রভৃতি নদী বিধৌত দেওয়ানগঞ্জ ইতিহাসের আয়নায় ধারণ করে আছে এক বিশাল অপূর্ণতা আর দীর্ঘশ্বাস!
অথচ যদি পেছন ফিরে তাকাই তবে ইতিহাসের আয়নায় ভেসে উঠে একরাশ সমৃদ্ধতা। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে তিস্তামুখ ঘাটের সাথে বাহাদুরাবাদ ঘাটের নৌ-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হয় রেলওয়ে মেরিন বিভাগ। যার প্রথম সুপরিনটেডেন্ট ছিলেন লর্ড বারিংটন নামক এক দক্ষ ইংরেজ কর্মকর্তা। বারিংটনের সময় ‘দরবার’ ও ‘প্রিন্সেস মেরি’ নামক কয়লা চালিত জলযানে পার হত যাত্রী ও ওয়াগন।
বেশ পরে বিশ শতকের দিকে আধুনিকায়ন হয়ে আসে ডিজেলচালিত যাত্রীবাহী স্টিমার ও ওয়াগনবাহী টাগবোট।
যমুনার বুক চিরে একসময় তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠে রেলফেরী। তিস্তা আর একতা ট্রেন ভিড়ত নদীর দুই পাড়ে। হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ঘাটটি পরিণত হয় উত্তরাঞ্চলের সাথে যোগাযোগের মূল কেন্দ্র। ঘাটসহ এই অঞ্চলের নিরাপত্তায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাহাদুরাবাদ নৌ-থানা। বাহাদুরাবাদ এক্সপ্রেস নামে ট্রেনও চালু হয় যা চলত চট্টগ্রাম থেকে ঘাট পর্যন্ত। বাহাদুরাবাদ ঘাট অকার্যকর হয়ে ইতিহাসে স্থান পাওয়ার আগে ঘাট ও ঘাটকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বপ্ন দেখিয়েছিল অযুত সম্ভাবনার। অভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে ঘাটটির গুরুত্ব প্রাণচঞ্চল করেছিল এই উপজেলাকে।
এখান থেকে সময়ের সাথে হতে পারত সেখান থেকে একটি বৃহৎ শুরু। কিন্তু তা আর হয়নি। ঘাট অকার্যকর হওয়ার পর এই অঞ্চলও হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে। অথচ অনেক কিছুই হতে পারত। এই অঞ্চলের কথা কেউ তখন ভাবেনি। ভাবলে এত অবহেলা কি পাওনা ছিল না দেওয়ানগঞ্জের ভাগ্যে? যার অতীত বর্ণিল ছিল সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে।
স্বাধীনতা যুদ্ধে অপারেশন বাহাদুরাবাদ ঘাট মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। কর্ণেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে জেড ফোর্সের একটি ব্যাটালিয়ন ভারতের তেলঢালা ঘাঁটি থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে এই দু:সাহসী অভিযান পরিচালনা এবং অভিযান শেষে নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করেন। যা ছিল অত্যন্ত একটি দু:সাহসী ঘটনা। এই অভিযানে অ্যাসল্ট কমান্ডার হিসেবে আক্রমনে নেতৃত্ব দেন লে. কর্ণেল নুরন্নবী খান বীরবীক্রম।
বাহাদুরাবাদ ঘাটের অবস্থান ভৌগলিক ও সামরিক কারণে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘাটের মাধ্যমেই ঢাকা থেকে বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে ভারি সরঞ্জাম, অস্ত্র, খাদ্যসামগ্রী, জনবল প্রেরণ করা হত। তাই দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তথা ততকালীন বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ইত্যাদি অঞ্চলে নিয়ন্ত্রন রাখার জন্য বাহাদুরাবাদ ঘাট ও এই নৌ-রুট ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সে সময়ে পাকিস্থানী বাহিনীর এই চেইন ভাঙ্গতে এই নৌ-রুটকে অকার্যকর করা জরুরী হয়ে পড়েছিল। আর সেকারনেই বেছে নেওয়া হয়েছিল বাহাদুরাবাদ ঘাটে অভিযানের মত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। বাহাদুরাবাদ ঘাটে অভিযান চালিয়ে পাকিস্থানী বাহিনীর অভিযান ধ্বংস করতে সমর্থ হন মুক্তিযোদ্ধারা। এই অভিযানের সফলতা মুক্তিবাহিনীকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।
স্বাধীনতার পর বাহাদুরাবাদ ঘাট পুনরায় চালু হলেও ঘাটটি প্রথম ধাক্কা খায় নব্বইয়ের দশকে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায়। নাব্যতা হ্রাসে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় তিস্তামুখ ঘাট থেকে সরিয়ে ওইপারের ঘাট স্থানান্তরিত হয় বালাসীঘাটে। বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হলে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সক্রিয় থাকার পর অনেকটা গুরুত্ব হারায় এই ঘাটকেন্দ্রিক যোগাযোগ। সেই সাথে উপজেলা হিসেবে গুরুত্ব হারায় দেওয়ানগঞ্জ। বছরের পর বছর এই নৌ-পথে সেবা দেওয়া জলযান বাহাদুর শাহ, মীর জুমলা, ঈসা খাঁ, তিতুমীর ও বৈরাম খাঁ নামগুলো পরিণত হয় শুধুই ইতিহাসে।
