Skip to content
November 8, 2026
বকশীগঞ্জ: জামালপুরের সবচেয়ে ছোট উপজেলার কথা
জনপদ

বকশীগঞ্জ: জামালপুরের সবচেয়ে ছোট উপজেলার কথা

In This Article

    নয়ন আসাদ: জামালপুর জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা বকশীগঞ্জ। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানা ঘেঁষে অবস্থান এই উপজেলার। এর একদিকে বয়ে গেছে ব্রক্ষপুত্র নদ অপরদিকে বুক উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিস্তৃত গারো পাহাড়।
    এই উপজলোর সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্বর্পূণ অধ্যায়ের স্মৃতি। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সহ, মুক্তিযুদ্ধের একটি বীরত্বর্পূণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে এই উপজেলার সাথে।
    ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে বকশীগঞ্জ ইউনিয়ন হিসেবে অর্ন্তভূক্ত হয়েছিল দেওয়ানগঞ্জ থানার অধীনে । যা ছিল তৎকালীন পাতিলাদহ পরগণার অধীনে। ইউনিয়ন থেকে উপজেলায় রুপান্তরিত হওয়া ঐতিহাসিক এই উপজেলা সম্পর্কে আপনাদের জানাব আজ।

    বকশীগঞ্জ নামের সাথে জড়িয়ে আছে ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহের নেতা মজনু শাহের শিষ্য ফকির মাদার বখশের নাম। ইংরেজদের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে ফকিরদের নেতা মজনু শাহ পরাজিত হলে তার শিষ্যরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। আজকে যে অঞ্চলটি বকশীগঞ্জ নামে পরিচিত তা তখন পরিচিত ছিল রাজেন্দ্রগঞ্জ নামে।

    ফকির বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা ফকিরদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে দমননীতি নেয়। যার ফলে ফকিরগণ বাধ্য হন দলবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে। ফকির মজনু শাহের একজন শিষ্য ফকির মাদার বখশ তার প্রেক্ষিতেই চলে আসেন তৎকালীন দেওয়াগঞ্জ থানার অধীন এই রাজেন্দ্রগঞ্জ অঞ্চলে। স্থাপন করেন খানকাহ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ফকিরদের শ্রদ্ধার চোখে দেখত সবাই। ফকির মাদার বকশও তেমনি একজন শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে সমাদৃত হন। বকশী ফকিরের নাম ডাক একসময় ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাবে পরবর্তীকালে তার নামেই অঞ্চলের নামকরন হয়ে যায় বকশীগঞ্জ।

    ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে বকশীগঞ্জের কামালপুর যুদ্ধ অনন্য স্থান দখল করে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সীমান্তবর্তী বকশীগঞ্জ ছিল কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। পাকিস্থানি বাহিনীর শক্ত ঘাটি ছিল কামালপুরে। যার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বেশ কয়েকটি তুমুল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় মুক্তিযোদ্ধাদের।

    মুক্তিযুদ্ধে ১১ নং সেক্টরের অধীনে ছিল বকশীগঞ্জ। এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, কর্ণেল তাহের ও উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান বীরবীক্রম। ১১ নং সেক্টরের অধীনে বেশ কয়েকটি বড় অপারেশন ছাড়াও মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জেড ফোর্স আলাদা অভিযান পরিচালনা করেছিল কামালপুর যুদ্ধে। লাগাতার এই যুদ্ধে পাক হানাদারদের পাশাপাশি ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হন মুক্তিযোদ্ধারও। ধারাবাহিক এই যুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের।

    এই যুদ্ধে শহীদ হন ক্যাপ্টেন সালাউদ্দনি মমতাজ, নায়ক আবদুস সালাম, ল্যান্স নায়ক গোলাম মোস্তফা, মতিউর রহমান ও নায়ক সিরাজুল ইসলাম সহ ১৯৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। সেক্টর কমান্ডার র্কর্ণেল তাহের কামালপুর যুদ্ধে তার এক পা হারান। এছাড়াও আহত হন, মেজর হাফিজ, লে. আবদুল মান্নান সহ আরো শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। অন্ততপক্ষে বিশবার তিট এন্ড রান ও চারবার নিয়মিত বাহিনীল সেটপিস যুদ্ধের পরেও ৪ই ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের অপেক্ষা করতে হয় পাকিস্থানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করতে। ৫ ডিসেম্বর বকশীগঞ্জ উপজেলা শত্রমুক্ত হয়।

    স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর উত্তম, বীর বীক্রম ও বীর প্রতিক মিলিয়ে মোট ২৯ জন মুক্তিযোদ্ধা সাহসিকতার জন্য পদক পেয়েছেন ধানুয়া কামালপুরের যুদ্ধে। যা ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য। এ থেকে আন্দাজ করা যায় এই যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে।

    মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৮২ সালে এসে ইউনিয়ন থেকে থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত পায় বকশীগঞ্জ। ২০১৩ সালের ০৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় বকশীগঞ্জ পৌরসভা। আয়তনে প্রায় ২০৪ বর্গমাইলের এই থানা শহরটিতে রয়েছে ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বকশীগঞ্জ উপজেলা ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে জামালপুর-১ সংসদীয় আসন। আর এ আসনটি জাতীয় সংসদে ১৩৮ নং আসন হিসেবে চিহ্নিত।

    ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এখানে শীতকালে অনূভূত হয় অতিরুক্ত কুয়াশা ও প্রচন্ড শীত।
    গারো, কোচ সহ এখানে বাস করে বেশ কিছু ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষ। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে রকমারী শাক-সবজির উৎপাদন হয় প্রচুর। এছাড়াও ধান, পাট, গম, সরষিা, মিষ্টি আলু, পেঁয়াজ, মরিচসহ নানা ধরনের কৃষি ফসলের ব্যাপক উৎপাদন হয় এখানে।

    উপজেলার লাউচাপাড়া অবসর বিনোদন কেন্দ্র উপজেলার অন্যতম দর্শনীয় জায়গা। পাহাড়-ঝর্ণা আর সবুজের অনাবিল সৌন্দর্যে ঢাকা লাউচাপড়ায় মুখরিত থাকে হাজারো মানুষের পদচারণায়। এছাড়াও কামালপুরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিসৌধ, গারো পাহাড়, নিলক্ষ্মিয়া ও চরকাউরিয়ায় নীলকুঠির ভগ্নাবশেষ, মহারাজা প্রদ্যুত কুমার ঠাকুরের ধ্বংসপ্রাপ্ত কাচারিভবন, ঐতিহ্যবাহী দালানি জামে মসজিদ, ধনুয়া কামালপুর স্থল বন্দর এই উপজেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় জায়গা।

    তবে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, দশানী ও জিঞ্জিরাম নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই অঞ্চলটি শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানে পিছিয়ে রয়েছে এখনো। তারপরেও এ অঞ্চলের নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে রয়েছে আলোকিত আগামীর স্বপ্ন। যা আগামীতো হয়তো উপহার দেবে একটি সুন্দর -আলোকিত বকশীগঞ্জ।

    React:

    Leave a Comment

    Your email address will not be published.

    Theme by Jhinai Technologies