Skip to content
November 8, 2026
নাকবা থেকে গাজা ধ্বংসস্তূপ: এক ব্যক্তির সারাজীবনের বাস্তুচ্যুতি
জনপদ

নাকবা থেকে গাজা ধ্বংসস্তূপ: এক ব্যক্তির সারাজীবনের বাস্তুচ্যুতি

In This Article

    গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে আংশিক ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিজের ঘরের ভেতর বসে আছেন ৮৫ বছর বয়সী আবদেল মাহদি আল উহাইদি। চারপাশে ভাঙা দেয়াল, গুঁড়িয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি আর যুদ্ধের নিঃশব্দ ধ্বংসচিহ্ন। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই তিনি একটি ছোট আগুন জ্বালিয়ে কফি বানাচ্ছেন। তিনি তাকিয়ে আছেন নিজের জীবনের বাকি অংশের দিকে, যেখানে এখন আর কিছুই আগের মতো নেই, শুধু ধ্বংস আর স্মৃতি।

    তার পাশে বসে আছেন তার স্ত্রী আজিজা, তিনিও বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে তাদের বিয়ে হয়। বহু চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের কোনো সন্তান হয়নি। তবুও তারা একে অপরকে আঁকড়ে ধরেই পুরো জীবন পার করে এসেছেন।


    শৈশব ও হারানো জন্মভূমি

    আবদেল মাহদি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪০ সালে। শৈশব কেটেছিল বির আল সাবা, বর্তমান বীরশেবা শহরে। সেখানে তাদের পরিবার জমি, পশুপাখি এবং স্বাভাবিক এক জীবনের মধ্যে শান্তভাবে বসবাস করত।

    তিনি এখনো সেই সময়কে মনে করতে পারেন, যখন জীবন ছিল সহজ, পরিচিত এবং নিরাপদ।

    কিন্তু ১৯৪৮ সালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। চারদিকে ভয়, গুজব এবং যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়ে। মানুষজন বিভক্ত হয়ে পড়ে, কেউ ঘর ছাড়তে চায়, কেউ বিশ্বাস করে থেকে গেলে হয়তো রক্ষা পাওয়া যাবে।

    শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় তারা পশ্চিম দিকে গাজার দিকে যাবে, এই বিশ্বাসে যে কিছুদিন পর আবার ফিরে আসা যাবে, আবার নিজের ঘরে ফেরা যাবে।

    এইভাবেই আবদেল মাহদি তার পরিবার, বাবা মা, ভাইবোন এবং আত্মীয়দের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে ঘর ছাড়েন। তারা দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে গাজার দিকে রওনা হন।

    দিনের পর দিন তারা হাঁটেন, ক্লান্ত হয়ে থামেন, আবার চলতে থাকেন। তখন কেউই ভাবেননি যে এই অস্থায়ী যাত্রা একদিন আজীবনের নির্বাসনে পরিণত হবে।


    গাজায় শরণার্থী জীবন

    গাজায় এসে প্রথমে তারা আশ্রয় নেয় গাজা সিটির জেইতুন এলাকায়। পরে তারা চলে যায় জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে।

    সেখানকার জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাঁবুর নিচে থাকা, যেখানে বৃষ্টি এলে ভিজে যায়, বাতাসে উড়ে যায়, শীতে কাঁপিয়ে তোলে এবং গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। খাবার এবং পানির জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, উকুন এবং দারিদ্র্য সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন ছিল এক কঠিন সংগ্রাম।

    তবুও তারা বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।

    আবদেল মাহদি এবং তার ভাইয়েরা কঠোর পরিশ্রম করে ধীরে ধীরে ঘর তোলেন, জমি কেনেন এবং ভাঙা জীবনটাকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যেন হারিয়ে যাওয়া জীবনের কিছুটা হলেও ফেরত পাওয়া যায়।


    প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন

    তার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটাই কথা বলে এসেছে, একদিন তারা নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাবে।

    এই বিশ্বাসই তাদের টিকে থাকার শক্তি ছিল।

    কিন্তু বাস্তবতা কখনো সেই স্বপ্নকে পূরণ হতে দেয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে নতুন যুদ্ধ, নতুন ধ্বংস এবং নতুন করে আবার শুরু করার যন্ত্রণা।

    আবদেল মাহদি বহু বছর ইসরায়েলে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন, যখন সুযোগ মিলত। তিনি এবং তার ভাইয়েরা ঘর বানিয়েছেন, জমি কিনেছেন। তারা ভেবেছিলেন, হয়তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

    তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে অতীতের ক্ষতি ধীরে ধীরে পূরণ হচ্ছে।

    কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই পুরো বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা আবার ফিরে যান শূন্যতায়, যেখানে কিছুই অবশিষ্ট নেই, না ঘর, না সম্পদ, না ছায়া ফেলার মতো কোনো স্মৃতি।

    তার মতে, গাজা আগেও বহু যুদ্ধ এবং অবরোধ দেখেছে, কিন্তু এমন ধ্বংস আগে কখনো দেখা যায়নি।


    ২০২৩ সালের যুদ্ধ এবং নতুন বাস্তুচ্যুতি

    ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় নতুন যুদ্ধ শুরু হলে আবদেল মাহদি আবারও বাস্তুচ্যুত হন, এইবার জীবনের শেষ বয়সে দুর্বল শরীর নিয়ে।

    তিনি তার বৃদ্ধ স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যান। কখনো পশ্চিম গাজা সিটি, কখনো দেইর আল বালাহ, আবার কখনো জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে আশ্রয় নেন।

    কিন্তু আশ্রয়ও আর নিরাপদ থাকে না। একসময় ইসরায়েলি সেনারা সেই স্কুলে প্রবেশ করে এবং মানুষদের জোর করে দক্ষিণের দিকে চলে যেতে বাধ্য করে।

    বৃদ্ধ এই দম্পতি একে অপরকে ধরে ধরে দীর্ঘ পথ হাঁটেন। পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দিকে। চারদিকে শুধু আতঙ্ক, বিস্ফোরণ এবং ভয়।

    তিনি বলেন, ঘর ছেড়ে বের হওয়া মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো নিজের মর্যাদা হারানো। তাঁবুতে, বালুর মধ্যে, অনাহার এবং অভাবের মধ্যে তাদের জীবন কাটে, যেখানে কিছুই নিজের মনে হয় না।

    কখনো কখনো তার মনে হয়েছে, এই কষ্ট সহ্য করার চেয়ে মৃত্যুই সহজ হতো। কিন্তু তবুও তারা বেঁচে থেকেছেন, দিনের পর দিন।


    ধ্বংসস্তূপে ফেরা

    যুদ্ধবিরতির পর ২০২৫ সালে মানুষদের উত্তর গাজায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। আবদেল মাহদি আবার ফিরে আসেন জাবালিয়ায়।

    কিন্তু ফিরে এসে তিনি যা দেখেন তা ছিল শুধু ধ্বংস। পুরো এলাকা যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। রাস্তা ভেঙে গেছে, ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন, পরিচিত সবকিছু যেন ইতিহাস হয়ে গেছে।

    তিনি ধীরে ধীরে লাঠির উপর ভর দিয়ে হাঁটেন। নিজের পুরোনো জায়গাগুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন, কিন্তু ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পান না। সেই পথে চলতে গিয়ে তিনি বহুবার পড়ে যান।

    তিনি বলেন, জীবনে তিনি অনেক যুদ্ধ দেখেছেন, ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধগুলো, কিন্তু কোনো কিছুই বর্তমান পরিস্থিতির মতো ভয়াবহ ছিল না।

    তার মতে, আগের অনেক সময়েই সেনারা ফিরে গেছে, পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু এবার সবকিছুই ভিন্ন। গাজার বড় অংশ ধ্বংস এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে, আর প্রতিদিনই গুলির শব্দ, ভয় এবং অনিশ্চয়তা।

    তিনি মনে করেন, যে শেষ যুদ্ধ বা শেষ সমাপ্তির কথা বলা হয়, তা আসলে বাস্তব নয়। এটি একটি চলমান, কখনো না থামা বিপর্যয়।


    শেষ অনুভূতি এবং জীবনদর্শন

    তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তার অনুভব, ফিলিস্তিনিরা প্রতিটি পর্যায়ে একা পড়ে থেকেছে, যুদ্ধ, ক্ষুধা, অবরোধ এবং ধ্বংসের মধ্যে নিজেরাই বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে।

    তার মতে, ইতিহাস বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে। তারা বারবার পরিত্যক্ত হয় এবং এক অসম শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়।

    তবুও তার ভেতরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা আছে, যা বারবার ভেঙে পড়ার পরও তাকে ধরে রাখে।

    তিনি বলেন, কেউ যদি তাকে নিউইয়র্কে একটি প্রাসাদও দেয় বিনিময়ে, তবুও তিনি এই ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর ছাড়বেন না।

    তার বিশ্বাস, যারা একবার দেশ ছেড়ে গেছে তারা আর ফিরে আসেনি। তাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মাটি আঁকড়ে থাকা।

    তার শেষ অনুভূতিটি এমন—তিনি মনে করেন, যারা একবার নিজেদের দেশ ছেড়ে চলে গেছে তারা আর ফিরে আসেনি। তার কাছে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, মানুষকে নিজের জন্মভূমি কখনোই ত্যাগ করা উচিত নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি এখানেই থাকবেন, এখানেই তার শেষ নিঃশ্বাস ফেলবেন এবং এখানেই তাকে দাফন করা হবে।

    Feature Image: Abdel Mahdi al-Wuheidi, a survivor of the 1948 Nakba and Israel’s genocidal war on Gaza [Abdelhakim Abu Riash/Al Jazeera]

    Caution: AI Translated

    React:

    Leave a Comment

    Your email address will not be published.

    Theme by Jhinai Technologies