ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আনাস আল-শরীফ ও মোহাম্মদ কোরাইকিয়া রবিবার গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালে সাংবাদিকদের তাঁবুর কাছে একটি ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে শহীদ হয়েছেন।
ক্যামেরাম্যান ইব্রাহিম জাহের ও মোহাম্মদ নুফালও ওই হামলায় শহীদ হয়েছেন। ২৮ বছর বয়সী আল-শরীফ, যিনি জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে, একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ছিলেন এবং যুদ্ধের সময় গাজার কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে এসেছিলেন।
তার শাহাদাতের আগে, আল-শরীফ একটি বিদায়বার্তা প্রস্তুত করেছিলেন, যা যদি তিনি নিহত হন তাহলে শেয়ার করার জন্য। তার পরিবার ও সহকর্মীরা তার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এটি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন।
নীচে সেই বার্তাটির বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো-
এটাই আমার শেষ ইচ্ছা, আমার শেষ বার্তা। যদি এই শব্দগুলো আপনার কাছে পৌঁছায়, তবে জানবেন – ইসরায়েল আমাকে হত্যা করে আমার কণ্ঠ স্তব্ধ করেছে। প্রথমেই সালাম জানবেন – আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আল্লাহ সাক্ষী, জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের সরু গলি আর ধুলোমাখা রাস্তায় চোখ খুলে জীবনের প্রথম শ্বাস নেওয়ার পর থেকেই আমি আমার জাতির সমর্থনে, জাতির পক্ষে কথা বলতে সর্বশক্তি ও শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছি। আশা ছিল, আল্লাহ আমাকে এতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন যাতে আমি আমার পরিবার ও প্রিয়জনদের নিয়ে ফিরে যেতে পারি সেই প্রিয় জন্মভূমি – দখলকৃত আসকালান (আল-মাজদাল) শহরে। কিন্তু আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার হুকুম আগে এসেছে, এবং তাঁর ফয়সালা চিরন্তন।
আমি বেঁচে থেকেছি এক অশেষ বেদনার ভিতর – বারবার হারিয়েছি প্রিয়জনদের, দেখেছি মৃত্যু ও ধ্বংসের বিভীষিকা। তবুও কখনও সত্য আড়াল করিনি, বিকৃত করিনি – কারণ আমি চাইতাম আল্লাহ সাক্ষী থাকুন তাদের বিরুদ্ধে যারা নীরব থেকেছে, যারা আমাদের হত্যাযজ্ঞকে মেনে নিয়েছে, যারা আমাদের শ্বাসরোধ করেছে; আর যাদের হৃদয় কাঁপেনি আমাদের শিশু ও নারীর ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ দেখে – যারা দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই মহাবিনাশ থামাতে কিছুই করেননি।
আমি আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি ফিলিস্তিনকে – যা মুসলিম বিশ্বের মুকুটের রত্ন, পৃথিবীর প্রতিটি স্বাধীন আত্মার হৃদস্পন্দন। আমি আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি এর মানুষকে – বিশেষ করে সেই নিষ্পাপ শিশুদের, যাদের জীবনে স্বপ্ন দেখার কিংবা নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগও আসেনি। যাদের কোমল দেহ ইসরায়েলি বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের নিচে পিষ্ট হয়ে গেছে, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে দেয়ালে, রাস্তায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে ছড়িয়ে পড়েছে।
আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি – শৃঙ্খল যেন আপনাদের কণ্ঠ স্তব্ধ না করে, সীমান্ত যেন আপনাদের পা থামিয়ে না দেয়। আপনারা যেন সেতু হন – এই মাটির মুক্তির পথে, এই মানুষের স্বাধীনতার পথে – যতদিন না মর্যাদা ও স্বাধীনতার সূর্য আমাদের ছিনিয়ে নেওয়া মাতৃভূমির আকাশে উঠে আসে।
আমি আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি আমার পরিবারকে – আমার সোনার মেয়ে শামকে, আমার চোখের আলো, যাকে বড় হতে দেখার স্বপ্ন আমি বুকের ভেতর লালন করতাম… অথচ তা পূর্ণ হলো না। তুলে দিচ্ছি আমার ছেলে সালাহকে – যাকে জীবনের পথে শক্ত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, যেন সে একদিন আমার বোঝা কাঁধে তুলে নিয়ে এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারে। তুলে দিচ্ছি আমার মা-কে – যার দোয়া ছিল আমার জীবনের দুর্গ, যার ভালোবাসা ছিল আমার পথের আলো। হে আল্লাহ, তাঁকে শক্তি দিন, তাঁকে পুরস্কৃত করুন আমার পক্ষ থেকে সর্বোত্তম পুরস্কারে।
আর তুলে দিচ্ছি আমার প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মে সালাহ (বায়ান)-কে – যাকে থেকে এই যুদ্ধ আমাকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আলাদা করে রেখেছে। তবুও তিনি ছিলেন অটল – সেই জলপাই গাছের মতো, যা কোনো ঝড়ে বাঁকে না। ধৈর্য, ঈমান আর ভালোবাসা দিয়ে তিনি আমার অনুপস্থিতিতে সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
আমি আপনাদের অনুরোধ করছি – আপনারা তাঁদের পাশে থাকবেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহর পরে আপনারাও তাঁদের ভরসা হোন। যদি আমি মরে যাই, তবে আমি মরব আমার নীতিতে অটল থেকে। আল্লাহর সামনে সাক্ষ্য দিচ্ছি – আমি তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট, তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত, এবং নিশ্চিত যে, তাঁর কাছে যা আছে তা-ই শ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী।
হে আল্লাহ, আমাকে শহীদদের কাতারে কবুল করুন, আমার অতীত ও ভবিষ্যতের গুনাহ ক্ষমা করুন, আর আমার রক্তকে এমন আলো বানিয়ে দিন যা আমার জাতি ও পরিবারের স্বাধীনতার পথে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। যদি কোথাও কমতি থেকে থাকে, ক্ষমা করুন। আমার জন্য রহমতের দোয়া করুন – কারণ আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি, কখনও বদলাইনি, কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।
গাজাকে ভুলে যাবেন না… আর আমাকে ভুলে যাবেন না – আপনাদের আন্তরিক দোয়ায়।
আনাস জামাল আল-শরীফ
০৬.০৪.২০২৫

