মস্কো যেমন বিদেশে থাকা ভিন্নমতাবলম্বীদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশও রুশ অভিবাসীদের বৈধভাবে থাকার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত করছে।
চলতি মাসের শুরুতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এমন একটি নতুন আইনে স্বাক্ষর করেছেন, যার লক্ষ্য বিদেশে বসে তার শাসনের বিরোধিতা করা রুশ নাগরিকেরা। নতুন এই আইনের আওতায় রাজনৈতিক মামলায় অনুপস্থিতিতে দণ্ডিত রুশ নাগরিকদের কনস্যুলার সেবা দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, ‘বিদেশি এজেন্ট’ আইন লঙ্ঘন কিংবা রুশ সেনাবাহিনীকে ‘অসম্মান’ বা ‘বদনাম’ করার মতো বিভিন্ন অভিযোগে দণ্ডিত ব্যক্তিরা আর রুশ পাসপোর্ট নবায়ন করতে পারবেন না। এমনকি বিদেশে থাকা রুশ দূতাবাস ও কনস্যুলেট থেকে প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবাও তারা নাও পেতে পারেন। এর ফলে হাজার হাজার রুশ নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ইতিমধ্যে ব্যক্তি ও সংগঠন মিলিয়ে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে রাশিয়ায় ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশও ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের বিরোধিতা করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া রুশ নাগরিকদের জন্য বসবাসের অনুমতি নবায়ন ও রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার পথ কঠিন করে তুলছে।
অর্থাৎ, যুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরোধিতা করার কারণে যারা রাশিয়া ছেড়ে পালিয়েছেন, তারা এখন দুই দিক থেকেই চাপের মুখে। একদিকে রুশ সরকার তাদের শাস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশও তাদের জন্য নিরাপদ ও বৈধভাবে থাকার সুযোগ সংকুচিত করছে।
আমি নিজেও জানি, এই পরিস্থিতি কেমন।
২০২২ সালের মে মাসে রাশিয়া আমার ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে এটি ছিল রুশ কর্তৃপক্ষের প্রথম দিককার পরিচিত ঘটনাগুলোর একটি।
ওই বছরের মার্চে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর প্রতিবাদ করায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমি রাশিয়া ছেড়ে পালিয়ে যাই। প্রায় এক বছর ধরে আইনি প্রক্রিয়া চলার পর রুশ কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত আমার একমাত্র নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আমার পরিবারের সদস্যদের আটক ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। তাদের মাত্র তিন দিনের মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আমি তখন জার্মানিতে নির্বাসিত অবস্থায়। সেখানেই আমি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ি। একই সঙ্গে পরবর্তী ৫০ বছরের জন্য রাশিয়ায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়।
সৌভাগ্যক্রমে আমার বংশগতভাবে আর্মেনীয় পরিচয় ছিল। ফলে আমি আর্মেনিয়ার নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পেরেছিলাম। সেটি পেতে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর।
সেই সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসা নাগরিকদের জন্য কিছু মানবিক ভিসা কর্মসূচি চালু ছিল। কিন্তু সেসব ব্যবস্থারও যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল। আমার ক্ষেত্রে এমন একটি ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে যেতে হতো। অথচ বৈধ পাসপোর্ট ছাড়া আমার পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করাই সম্ভব ছিল না।
এরপর বিদেশে অবস্থানরত রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য রাশিয়া একের পর এক আইনি ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
২০২৩ সালে প্রণীত নতুন নাগরিকত্ব আইনে এমন বিধান যুক্ত করা হয়, যার মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধরনের অপরাধে দণ্ডিত হলে নাগরিকত্ব বাতিল করা সম্ভব। এর মধ্যে রুশ সেনাবাহিনীকে ‘অসম্মান’ বা ‘বদনাম’ করার অভিযোগ, উগ্রবাদ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও রয়েছে।
ফলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষের রুশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, ততটা পায়নি।
নতুন আইনটি রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের কার্যত রাষ্ট্রহীন করে দেওয়ার আরেকটি পথ তৈরি করেছে। যাদের বিরুদ্ধে এটি প্রয়োগ করা হবে, তারা কাগজে-কলমে রুশ নাগরিকই থাকবেন। কিন্তু বাস্তবে নাগরিকত্বের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সেবাগুলো থেকে বঞ্চিত হবেন।
এখানেই সমস্যাটি আরও গুরুতর।
যেহেতু তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্বহীন ঘোষণা করা হচ্ছে না, তাই ১৯৬১ সালের রাষ্ট্রহীনতা হ্রাস-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন যেসব সুরক্ষা দেয়, তার সুবিধাও তারা সরাসরি নাও পেতে পারেন। অর্থাৎ নাগরিকত্ব পুরোপুরি বাতিল না করেও তাদের এমন এক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
রুশ নাগরিকদের নাগরিক অধিকার ব্যাপকভাবে কেড়ে নেওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়।
১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পরও লাখ লাখ রুশ নাগরিক দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। তাদের অনেকের নাগরিকত্ব নতুন সোভিয়েত সরকার বাতিল করে দিয়েছিল। সেই সময় রুশ শরণার্থীদের ঢল সামলাতে ১৯২২ সালে লীগ অব নেশনস ‘নানসেন পাসপোর্ট’ নামে একটি বিশেষ ভ্রমণ নথি চালু করেছিল। যেসব মানুষ নিজেদের রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার হারিয়েছিলেন, তাদের জন্য এটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ভ্রমণ নথি।
নানসেন পাসপোর্ট ব্যবস্থা ১৯৪২ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রহীন মানুষদের নিরাপদ ও বৈধ অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য নতুন ব্যবস্থা তৈরির পরিবর্তে অনেক সরকার উল্টো তাদের জন্য পথ আরও সংকুচিত করছে।
রুশ নাগরিকদের জন্য ইউরোপে অবস্থান করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের পালিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান গন্তব্য। কিন্তু সেখানে মানবিক ভিসা পাওয়ার সুযোগ এখন অত্যন্ত সীমিত। বাস্তবে কেবল পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী কিংবা ইউরোপীয় সরকারের কাছে বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে এমন ব্যক্তিরাই কার্যকর সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে রুশ সামরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। জার্মান সরকার রুশ সামরিক বাহিনীর কিছু পলাতক সদস্যকে তৃতীয় কোনো দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অথচ তাদের রাশিয়ায় ফিরে গেলে কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে, সেটি নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত কারাগারে পৌঁছেছেন। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে তারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পড়েছেন।
ফিনল্যান্ডেও পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর দেশটি এক হাজারের বেশি রুশ নাগরিককে বহিষ্কার করেছে এবং ১ হাজার ১০০-এর বেশি আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।
বাল্টিক দেশগুলোতেও রুশ নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ বাড়ছে। এমনকি এস্তোনিয়ায় রুশ নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে।
রাশিয়ার বাইরে রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের বিকল্পও খুব বেশি নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে আশ্রয় আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে অনির্দিষ্টকালের স্থগিতাদেশ রয়েছে এবং সেখানে শত শত রুশ আশ্রয়প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মধ্য এশিয়ার কিছু দেশও মস্কোর অনুরোধে রুশ নাগরিকদের বহিষ্কার করছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার কয়েকটি দেশে রুশ নাগরিকদের প্রবেশের নিয়ম তুলনামূলকভাবে সহজ থাকলেও সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
আমি বুঝতে পারি, রুশ রাষ্ট্রের ব্যাপারে বিভিন্ন সরকারের সন্দেহের কারণ আছে। তারা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা, গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকি ঠেকাতে চায়। এসব উদ্বেগও অমূলক নয়।
কিন্তু নাগরিকত্বকে যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তখন যে মানুষগুলো একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরোধিতা করছে, তারাই সেই সরকারের হাত থেকে পালিয়ে এমন দেশে আশ্রয় নেওয়ার পরও শাস্তির মুখে পড়ে, যেসব দেশ নিজেদেরকে সেই কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরোধী বলে মনে করে।
এখন বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। রাশিয়ায় আবারও নতুন করে সেনা সমাবেশ বা মোবিলাইজেশনের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় অনেক রুশ নাগরিক দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন।
কিন্তু যারা সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিদেশে গিয়ে আশ্রয় চাইতে চান, বিশেষ করে রুশ পুরুষদের জন্য বর্তমানে নিরাপদ ও নিশ্চিত কোনো পথ নেই।
অন্যদিকে পুতিন যেন রুশ জনগণকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করছেন।
গত মাসে তিনি দাবি করেন, যেসব নাগরিকের সঙ্গে তার দেখা হয় তারা তাকে বলেন, ‘যদি বিশেষ সামরিক অভিযান’—অর্থাৎ ইউক্রেনের যুদ্ধ—শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাদের আর কী করার থাকবে?
রাশিয়া গত কয়েক বছর ধরে তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সমাজকে এমনভাবে যুদ্ধকেন্দ্রিক করে তুলেছে যে দেশটির নেতা এখন এমন একটি ধারণা সামনে আনছেন, যেখানে যুদ্ধ ছাড়া মানুষের জীবনের আর কোনো কল্পনাই যেন সম্ভব নয়।
কিন্তু যারা সক্রিয়ভাবে শান্তির কথা ভাবছেন এবং শান্তির জন্য কাজ করছেন, তারা সেই রুশ নাগরিকেরা, যারা নিজেদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাদের শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে, যেসব সরকার নিজেদেরকে পুতিনের শাসনের বিরোধী বলে মনে করে, তাদের উচিত এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো।
তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। অথবা অন্তত এমন কোনো বৈধ ও নিরাপদ আইনি মর্যাদা দেওয়া উচিত, যার মাধ্যমে তারা নির্বাসনে থেকেও নিরাপদে জীবনযাপন ও কাজ করতে পারেন।
কারণ রাশিয়ার একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য যারা কাজ করতে চান, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই শেষ পর্যন্ত শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণেরই একটি অংশ।
আল জাজিরা থেকে এআই অনুবাদ




