নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু হয়েছে। খবরটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন ঢাকার ভিড় ঠেলে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা নানা প্রয়োজনে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেন, তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এই স্বস্তি যেন রাজধানীর কয়েকটি নির্দিষ্ট রুটেই আটকে না থাকে।
কারণ নারীর যাতায়াতের সবচেয়ে কঠিন গল্পগুলো রাজধানীর ঝকঝকে সড়কগুলোতেই লেখা হয় না। লেখা হয় রাজধানীর আশেপাশের শিল্পাঞ্চলের সড়কগুলোতেও।
আমি গাজীপুরে থাকার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি- গার্মেন্টস কারখানাগুলোর আশপাশে নারীদের যে যাতায়াত থাকে, তাকে শুধু ‘ভিড়’ বললে কম বলা হয়। সেটা অনেক সময় রীতিমতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। হাজার হাজার শ্রমিক একই সময়ে কারখানা থেকে বের হচ্ছেন। একটি বাস আসছে, আর মুহূর্তেই সেটি ঘিরে ধরছেন অসংখ্য মানুষ।
সেখানে একজন নারী শ্রমিকের জন্য বাসে ওঠা মানে কেবল একটি আসন পাওয়ার চেষ্টা নয়। তাকে ভিড় ঠেলে উঠতে হয়, নিজের শরীরটাকে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ থেকে বাঁচাতে হয়, ব্যাগ কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সামলাতে হয়। কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো দরজার কাছে ঝুলে, কখনো বা পরের বাসের অপেক্ষায় দিনের ক্লান্তি আরও বাড়াতে হয়।
এই বাস্তবতায় রাজধানীতে ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া একটি ভালো উদ্যোগ। আমাদের চাওয়া থাকবে এ উদ্যোগ ঢাকার সীমানা পেরিয়ে নারীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের জায়গাগুলোতেও পৌঁছাবে।
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জসহ যেসব এলাকায় হাজার হাজার নারী প্রতিদিন কারখানায় যাতায়াত করেন, সেখানেও কি নির্দিষ্ট নারী বাস চালু করা যায় তবে নি:সন্দেহে স্বস্তি আনবে অসংখ্য নারীদের জীবনে।
কারখানাভিত্তিক কিংবা শিল্পাঞ্চলভিত্তিক নারী পরিবহণ ব্যবস্থা হতে পারে এর একটি বাস্তবসম্মত সমাধান। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানার মালিক সমিতি, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিআরটিসি যৌথভাবে এমন ব্যবস্থা করতে পারে।
এতে শুধু নারীর যাতায়াত সহজ হবে না। কর্মস্থলে নারীর উপস্থিতিও আরও নিরাপদ ও নিয়মিত হতে পারে। পরিবারের অনেকের কাছে মেয়েদের চাকরি নিয়ে যে নিরাপত্তার উদ্বেগ থাকে, সেটিও কিছুটা কমতে পারে।
আমাদের উন্নয়ন আলোচনায় নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে অনেক কথা হয়। পোশাকশিল্পে নারীর অবদান নিয়ে অনেক পরিসংখ্যানও আছে। কিন্তু একজন নারী শ্রমিক প্রতিদিন কীভাবে কর্মস্থলে পৌঁছান, সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকে যায়। অথচ কর্মস্থলে যাওয়ার পথটিও তার কর্মজীবনের অংশ।
‘পিংক বাস’ তাই কয়েকটি বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না হোক। হয়ে উঠুক-নারীর নিরাপদ চলাচলের একটি নতুন উদ্যেগের শুরু।
