জনজীবন চিত্র: প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকে ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, ফলমূলসহ নানা ধরনের খাবার। এর পাশাপাশি চা-কফিতে চিনি, রান্নায় বাড়তি লবণ, বিকেলের নাশতায় বিস্কুট কিংবা ভাজাপোড়া এবং তৃষ্ণা মেটাতে কোমল পানীয়ও অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। এসব খাবারের কিছু শরীরের প্রয়োজন মেটালেও অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে খাবারের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ, মুক্ত চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে বেশি প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম ও পূর্ণশস্যের মতো পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
লবণ কমান, স্বাদের বিকল্প খুঁজুন
বাঙালির খাবারে লবণ অপরিহার্য উপাদান। ভাতের সঙ্গে ভর্তা, ডাল, মাছ কিংবা তরকারি, প্রায় সব খাবারেই লবণ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রান্নায় ব্যবহৃত লবণের বাইরেও আচার, চানাচুর, চিপস, নোনতা বিস্কুট, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবারের মাধ্যমে শরীরে অতিরিক্ত লবণ প্রবেশ করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে মোট লবণ গ্রহণের পরিমাণ পাঁচ গ্রামের কম হওয়া উচিত। রান্নায় ব্যবহৃত লবণ এবং প্যাকেটজাত খাবারে থাকা লবণ, দুটিই এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। পাঁচ গ্রাম লবণ প্রায় এক চা-চামচের সমান।
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ আবার হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। তাই খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমিয়ে আনা জরুরি।
এর জন্য রান্নায় ধীরে ধীরে লবণের পরিমাণ কমানো যেতে পারে। স্বাদ বাড়াতে লেবুর রস, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, আদা, রসুন ও অন্যান্য মসলা ব্যবহার করা যায়। খাবার টেবিলে আলাদা করে লবণ রাখা এবং অতিরিক্ত নোনতা আচার বা চানাচুর খাওয়ার অভ্যাসও কমানো দরকার।
চিনি শুধু মিষ্টিতে নয়, পানীয়েও
মিষ্টি, মিষ্টিজাতীয় খাবার কিংবা চায়ের চিনি যে শরীরে বাড়তি চিনির জোগান দেয়, তা অনেকেরই জানা। কিন্তু কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত ফলের জুস, এনার্জি ড্রিংক, সিরাপ ও মিষ্টি দইয়ের মতো খাবার থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি গ্রহণ করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মুক্ত চিনির পরিমাণ দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। আরও স্বাস্থ্যগত সুবিধার জন্য তা পাঁচ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরামর্শও রয়েছে। দৈনিক প্রায় দুই হাজার ক্যালরি গ্রহণকারী প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের সমান প্রায় ৫০ গ্রাম বা ১২ সমতল চা-চামচ চিনি। পাঁচ শতাংশের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৫ গ্রাম বা ছয় চা-চামচ। এটি একটি উদাহরণ; ব্যক্তির দৈনিক শক্তির চাহিদা অনুযায়ী হিসাব বদলাতে পারে।
মুক্ত চিনির মধ্যে খাবার বা পানীয় তৈরির সময় যোগ করা চিনি ছাড়াও মধু, সিরাপ এবং ফলের রস বা ঘনীভূত ফলের রসে থাকা চিনি অন্তর্ভুক্ত। তবে আস্ত ফলের প্রাকৃতিক চিনিকে এভাবে মুক্ত চিনি হিসেবে গণনা করা হয় না।
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ওজন বেড়ে যাওয়া এবং দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই প্রতিদিনের চায়ে অল্প অল্প করে চিনি কমানো, কোমল পানীয়ের পরিবর্তে নিরাপদ পানি পান করা এবং মিষ্টি খাবারকে নিয়মিত অভ্যাসের বদলে সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করা ভালো। ফলের রসের পরিবর্তে গোটা ফল খাওয়াও উপকারী বিকল্প।
অস্বাস্থ্যকর চর্বি: তেল-ঘি ব্যবহারে সচেতনতা
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য চর্বি প্রয়োজন। কিন্তু সব ধরনের চর্বি সমান উপকারী নয়। খাবারে সম্পৃক্ত চর্বি ও ট্রান্স ফ্যাট বেশি থাকলে হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চর্বির পরিমাণের পাশাপাশি এর ধরন ও উৎসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
মাখন, ঘি, চর্বিযুক্ত মাংস, পাম অয়েল ও নারকেল তেলে সম্পৃক্ত চর্বি থাকে। অন্যদিকে, শিল্পে উৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া যেতে পারে আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল দিয়ে তৈরি কিছু বেকারি পণ্য, বিস্কুট, ওয়েফার ও ভাজাপোড়া খাবারে। তবে সব বিস্কুট বা ভাজা খাবারে ট্রান্স ফ্যাট থাকবেই, এমন নয়; উপাদান ও তৈরির পদ্ধতির ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের কম সম্পৃক্ত চর্বি এবং এক শতাংশের কম ট্রান্স ফ্যাট থেকে আসা উচিত। শিল্পে উৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
খাবারে চর্বির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত তেলে ভাজার পরিবর্তে সেদ্ধ, ভাপানো বা অল্প তেলে রান্নার পদ্ধতি বেছে নেওয়া যায়। রান্নায় পরিমিত পরিমাণে সয়াবিন, সরিষা বা অন্যান্য উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা এবং মাংসের দৃশ্যমান চর্বি কমিয়ে নেওয়াও ভালো অভ্যাস। মাছ, বাদাম ও বীজ থেকে পাওয়া অসম্পৃক্ত চর্বি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
কোমল পানীয় ও মিষ্টি পানীয়ের অভ্যাস বদলান
গরমে তৃষ্ণা মেটাতে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কোমল পানীয় পান করা অনেকের অভ্যাস। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এসব পানীয়ের জনপ্রিয়তা রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত চিনিযুক্ত কোমল পানীয় পান করলে শরীরে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি প্রবেশ করে, অথচ তা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি খুব কমই পাওয়া যায়।
শুধু কোমল পানীয় নয়, প্যাকেটজাত ফলের জুস, চিনিযুক্ত চা-কফি, মিষ্টি দুধজাত পানীয় এবং বিভিন্ন সিরাপেও বাড়তি চিনি থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এসব পানীয়ের পরিবর্তে নিরাপদ পানি পান এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের গ্রহণ কমানোর পরামর্শ দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বিশেষ সচেতনতা প্রয়োজন।
বিকল্প হিসেবে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি সবচেয়ে সহজ পছন্দ। চা-কফিতে চিনি ধীরে ধীরে কমানো, প্রতিদিন কোমল পানীয় না কেনা এবং শিশুদের হাতে নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় তুলে না দেওয়ার মাধ্যমে অভ্যাস বদলানো সম্ভব। ফলের স্বাদ পেতে প্যাকেটজাত জুসের পরিবর্তে মৌসুমি আস্ত ফল খাওয়া ভালো।
অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার: সহজলভ্য বলেই কি স্বাস্থ্যকর?
ব্যস্ত জীবনে দ্রুত খাবার তৈরি কিংবা ক্ষুধা মেটাতে প্যাকেটজাত নুডলস, চিপস, বিস্কুট, কেক, মিষ্টি সিরিয়াল ও বিভিন্ন প্রস্তুত খাবারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এসব খাবারের অনেকগুলোতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকতে পারে। কিছু খাবারে পুষ্টিকর উপাদানের তুলনায় ক্যালরির পরিমাণও বেশি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত এবং লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিসমৃদ্ধ খাবার বেশি গ্রহণের সঙ্গে নেতিবাচক স্বাস্থ্যফলের সম্পর্ক রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তি হওয়া উচিত কম প্রক্রিয়াজাত বা অপ্রক্রিয়াজাত, বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার।
তবে মনে রাখতে হবে, সব প্রক্রিয়াজাত খাবার অস্বাস্থ্যকর নয়। দুধ পাস্তুরিত করা, ডাল শুকানো কিংবা সবজি হিমায়িত করাও প্রক্রিয়াজাতকরণের অংশ। সমস্যা মূলত এমন খাবার নিয়ে, যেগুলোতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা অস্বাস্থ্যকর চর্বি যোগ করা হয়েছে এবং যেগুলো নিয়মিত খেলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের মান কমে যেতে পারে।
প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় উপাদান ও পুষ্টিতথ্যের লেবেল দেখা উপকারী। একই ধরনের দুটি পণ্যের মধ্যে যেটিতে লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি কম, সেটি বেছে নেওয়া যেতে পারে। নাশতায় চিপস বা বিস্কুটের বদলে মৌসুমি ফল, ভাজা ছোলা কিংবা পরিমিত পরিমাণে বাদাম খাওয়া যায়।
স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই দামি খাবার নয়
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়তে দামি ফল, বিদেশি খাবার কিংবা বিশেষ কোনো খাদ্যতালিকার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের পরিচিত খাবারের মধ্যেই পুষ্টিকর বিকল্প রয়েছে। ভাতের সঙ্গে ডাল, মৌসুমি শাকসবজি, ছোট মাছ, ডিম এবং সহজলভ্য ফলমূল মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া সম্ভব। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবারের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে আলু ও অন্যান্য শ্বেতসারসমৃদ্ধ কন্দজাতীয় খাবার গণনা করা হয় না। সংস্থাটি পূর্ণশস্য, ডাল, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
মৌসুমি ফল ও সবজি কেনা, বাড়িতে রান্না করা এবং সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা করা খরচ নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিনের খাবারে একাধিক ধরনের সবজি রাখা, সম্ভব হলে গোটা ফল খাওয়া এবং অতিরিক্ত তেল-লবণ ছাড়া রান্নার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
ছোট পরিবর্তনেই শুরু হোক নতুন অভ্যাস
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়তে একদিনে সব অভ্যাস বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। প্রথম সপ্তাহে চায়ের চিনি কমানো, পরের সপ্তাহে রান্নায় লবণ নিয়ন্ত্রণ এবং এরপর কোমল পানীয় ও ভাজাপোড়া খাবারের পরিমাণ কমানোর মতো ছোট পদক্ষেপ নেওয়া যায়। খাবার কেনার সময় লেবেল দেখা এবং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সবজি ও ফল রাখার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শুধু ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। পরিবারের সচেতনতা, স্কুলে স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবেশ, বাজারে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা এবং খাদ্যপণ্যের সঠিক তথ্য নিশ্চিত করাও জরুরি। শিশুদের ছোটবেলা থেকে স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে পরিচিত করানো গেলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে থাকতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, সুস্থ থাকার জন্য কোনো একটি খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া কিংবা বিশেষ কোনো খাদ্য অনুসরণ করাই একমাত্র পথ নয়। বরং কী খাচ্ছি, কতটুকু খাচ্ছি এবং খাবারে কতটা বৈচিত্র্য রয়েছে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমিয়ে পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়ার অভ্যাসই হতে পারে সুস্থ জীবনের একটি কার্যকর পদক্ষেপ।


