Skip to content
November 8, 2026
উত্তপ্ত পৃথিবীতে প্রবীণদের নিঃশব্দ বিপদ
স্বাস্থ্যচিত্র

উত্তপ্ত পৃথিবীতে প্রবীণদের নিঃশব্দ বিপদ

In This Article

    জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, এই বাড়তি তাপের ঝুঁকি বিশেষ করে প্রবীণদের জন্য আমরা এতদিন যতটা মনে করতাম, তার চেয়ে অনেক বেশি। মানুষের শরীর যে মাত্রার তাপ সহ্য করতে পারে, সেই সীমা বয়স বাড়ার সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে তরুণদের জন্য সহনীয় যে তাপমাত্রা, একই পরিস্থিতি একজন বয়স্ক মানুষের জন্য মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

    যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মানুষের বয়সের সঙ্গে তাপ সহ্য করার ক্ষমতার পরিবর্তনকে হিসাবের মধ্যে এনে এই ঝুঁকির নতুন চিত্র তুলে ধরেছেন। গবেষণাটি দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহে বিশ্বজুড়ে প্রবীণদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

    ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সম্মানসূচক ক্লিনিক্যাল সিনিয়র লেকচারার ক্রিস মুলিংটনের মতে, এতদিনের অনেক গবেষণায় ধরে নেওয়া হতো যে সুস্থ তরুণ ও প্রবীণ সবাই প্রায় একই মাত্রায় গরম সহ্য করতে পারেন। এই ধারণা প্রবীণদের প্রকৃত ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেখিয়েছে। বিপজ্জনক গরমের জন্য তাই সবার ক্ষেত্রে একই তাপমাত্রার সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কে কতটা ঝুঁকিতে পড়বেন, তা ব্যক্তির বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।

    বিশ্বজুড়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০ কোটি। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। অর্থাৎ তাপপ্রবাহ যত বাড়বে, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যাও তত বাড়বে।

    কেন প্রবীণরা গরমে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?

    বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিকভাবে নিজেকে ঠান্ডা রাখার ক্ষমতা কমতে থাকে। তরুণ বয়সের তুলনায় প্রবীণদের ঘাম কম হয়। একই সঙ্গে গরমের সময় শরীরের তাপ বাইরে বের করে দিতে রক্তনালিগুলো আগের মতো প্রসারিত হতে পারে না। ফলে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

    আরেকটি সমস্যা হলো, প্রবীণরা অনেক সময় তাপমাত্রার পরিবর্তন তুলনামূলক কম অনুভব করেন। ফলে শরীর যখন বিপজ্জনক মাত্রায় উত্তপ্ত হতে শুরু করে, তখনও তারা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে নাও পারেন। এতে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় যাওয়া, পানি পান করা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ায় দেরি হতে পারে।

    অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিদ পিটার কাহং চ্যানের মতে, অনেক প্রবীণ এমন ভবনেও বসবাস করেন যেগুলো অতিরিক্ত গরম মোকাবিলার জন্য উপযোগী নয়। পুরোনো ভবনে বায়ু চলাচল কম, ছাদ ও দেয়াল দ্রুত উত্তপ্ত হওয়া কিংবা পর্যাপ্ত শীতলীকরণের ব্যবস্থা না থাকায় ঘরের ভেতরেও তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

    একপর্যায়ে শরীর যত দ্রুত তাপ শোষণ করছে, তার চেয়ে দ্রুত তাপ বের করে দিতে পারে না। তখন শুরু হয় এমন এক ধরনের তাপ-চাপ, যাকে বলা হয় ‘আনকমপেনসেবল হিট স্ট্রেস’। তরুণদের তুলনায় প্রবীণরা এই অবস্থায় অনেক কম তাপমাত্রাতেই পৌঁছে যেতে পারেন।

    গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় মাত্র ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ এমন তাপের মুখোমুখি হতে পারেন, যে মাত্রায় তরুণদের একই ঝুঁকিতে পড়তে হলে উষ্ণায়ন প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে হতো।

    বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ২০২৪ সালে বার্ষিক বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রথমবারের মতো ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়েছিল। তবে কয়েক দশকের গড় হিসেবে পৃথিবীর উষ্ণতা এখনো সেই সীমা স্থায়ীভাবে অতিক্রম করেনি।

    স্ট্যানফোর্ডের গবেষকদের হিসাব আরও উদ্বেগজনক। তাদের মতে, বছরে অন্তত ১৮০ ঘণ্টা নিজের বয়সের জন্য সহনীয় তাপমাত্রার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আগের হিসাবের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।

    এই ১৮০ ঘণ্টা অবশ্য একটানা হতে হবে এমন নয়। পুরো বছরের বিভিন্ন সময়ে জমা হওয়া অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ মিলিয়েই এই হিসাব করা হয়। এর অর্থ এই নয় যে ওই তাপমাত্রায় থাকা প্রত্যেক মানুষ নিশ্চিতভাবেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তবে শরীরের পক্ষে তাপ সামলে ওঠা কঠিন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

    ফলে এমন পরিবেশ, যা একজন সুস্থ তরুণ সহজেই সহ্য করতে পারেন, একজন প্রবীণের শরীরে অতিরিক্ত তাপ জমিয়ে দিতে পারে। শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে হিটস্ট্রোকসহ গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।

    চরম গরম শরীরের কী ক্ষতি করে?

    চরম গরম শুধু অস্বস্তির কারণ নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি জীবনহানিও ঘটাতে পারে। অতিরিক্ত তাপ শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে। এর ফলে হিটস্ট্রোক, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

    তবে শুধু বাতাসের তাপমাত্রা দিয়ে বিপদের মাত্রা বোঝা যায় না। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ, সূর্যের তাপ, বাতাসের চলাচল, শারীরিক পরিশ্রম, পরনের পোশাক এবং ব্যক্তির নিজের শরীর কতটা দ্রুত তাপ বের করে দিতে পারছে, সবকিছু মিলেই প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারিত হয়।

    বিশ্বের গড় তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও তার প্রভাব শুধু গড় তাপমাত্রার ওপর পড়ে না। এতে তাপমাত্রার পুরো পরিসরই ওপরে সরে যায়। ফলে আগে যে মাত্রার চরম গরম খুব কম সময় দেখা যেত, সেটি আরও ঘন ঘন, দীর্ঘ সময় এবং বেশি তীব্রতার সঙ্গে দেখা দিতে পারে।

    তাপপ্রবাহের সময় মৃত্যুর সব ঘটনা অবশ্য সরাসরি শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে না। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মৃত্যুর পেছনে আগে থেকে থাকা বিভিন্ন রোগের ভূমিকা থাকে। বিশেষ করে হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ অতিরিক্ত তাপে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ গরম অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি মৃত্যুর কারণ না হলেও বিদ্যমান রোগকে মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

    কোন অঞ্চলের প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি বিপদে?

    একদিকে পৃথিবীর তাপমাত্রা এমন গতিতে বাড়ছে, যা গত ১০ হাজার বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অন্যদিকে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে এবং জন্মহার কমছে। ফলে বিশ্বের জনসংখ্যায় প্রবীণদের অনুপাতও বাড়ছে। দুটি পরিবর্তন একসঙ্গে প্রবীণদের জন্য তৈরি করছে বড় ধরনের ঝুঁকি।

    বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে পারেন। চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেই বিপজ্জনক তাপের সংস্পর্শে থাকা প্রবীণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

    উষ্ণতা আরও বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের পরিধিও বাড়বে।

    গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ার সঙ্গে বছরে অন্তত ১৮০ ঘণ্টা শরীরের সহনীয় সীমার বাইরে থাকা তাপের মুখোমুখি হতে পারেন আরও প্রায় ১০০ কোটি মানুষ। এদের বড় অংশই প্রবীণ হতে পারেন, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অনেক কম তাপমাত্রাতেই ওই ঝুঁকিপূর্ণ সীমায় পৌঁছে যায়।

    উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে ভারত, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশেই প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ এমন তাপের সংস্পর্শে পড়তে পারেন বলে গবেষণাটিতে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্যভাবে আক্রান্ত মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।

    কীভাবে প্রবীণদের রক্ষা করা সম্ভব?

    জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু তাপমাত্রা কতটা বাড়ছে তা জানাই যথেষ্ট নয়। কোথায়, কখন এবং কতটা সময় ধরে মানুষের শরীরের তাপ সহ্য করার সীমা অতিক্রম করছে, সেটিও বোঝা জরুরি। কারণ সেই তথ্যের ভিত্তিতেই কার্যকর প্রস্তুতি ও সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

    শহরগুলোকে আরও সবুজ করে তোলা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বেশি গাছপালা ও সবুজ অবকাঠামো, উন্নত বায়ু চলাচল এবং শহরে মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে তৈরি অতিরিক্ত তাপ কমানোর ব্যবস্থা গরমের চাপ কমাতে পারে।

    তাপপ্রবাহের সময় শীতল থাকার জন্য বিশেষ ‘কুলিং সেন্টার’ বা শীতলীকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং দ্রুত সতর্কবার্তা ও জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা উন্নত করাও জরুরি।

    তবে সব মানুষের ঝুঁকি এক নয়। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন প্রবীণ, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

    আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা। প্রবীণদের অধিকাংশ তাপজনিত মৃত্যু ঘরের ভেতরেই ঘটে। তাই শুধু বাইরে তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করলেই হবে না, ঘরকেও নিরাপদ রাখতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা অন্যান্য শীতলীকরণ সুবিধা সহজলভ্য করতে হবে। এর জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    তবে এসব ব্যবস্থা মূলত ক্ষতি কমানোর উপায়। দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ মোকাবিলা না করলে ঝুঁকি কমানো কঠিন। আর সেই কারণেই গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

    পৃথিবী যত উষ্ণ হবে, চরম তাপের দিন তত বাড়বে। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের তাপ সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে প্রবীণদেরই।

    React:

    Leave a Comment

    Your email address will not be published.

    Theme by Jhinai Technologies