Skip to content
November 8, 2026
মূল্যস্ফীতির চাপে বাড়ছে দারিদ্র্য
অগোছালো

মূল্যস্ফীতির চাপে বাড়ছে দারিদ্র্য

In This Article

    দৈনিক সমকালের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কর্মসংস্থানের সংকট ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের দরিদ্র মানুষের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আয় বাড়ছে না, অথচ বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা অনেক মানুষও নতুন করে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই পরিস্থিতিতে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চাপ আরও বাড়ছে।

    পোশাকশ্রমিক মারুফ মজুমদারের জীবন এই সংকটের একটি উদাহরণ। ঘরভাড়া নিয়ে একবার অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পর থেকে নিজের খাওয়া-পরার আগে বাসাভাড়ার টাকা জোগাড় করে রাখেন তিনি। সংসারে রয়েছেন বৃদ্ধ মা ও তিন কন্যা। তাঁদের খাবারের ব্যবস্থাও করতে হয়। মাসের প্রথম সপ্তাহেই প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে তাঁর হাতে থাকা টাকা প্রায় শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় টানাটানি, আর তৃতীয় সপ্তাহে এসে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

    এভাবে চলতে গিয়ে এক প্রতিবেশীর কাছে ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন মারুফ। পাঁচ মাস আগে আগামী মাসের বেতন পেয়ে ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে সাত হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতি মাসেই সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছেন না। মজুরির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হারে বাড়তে থাকায় ধারদেনাই হয়ে উঠেছে তাঁর সংসার চালানোর অন্যতম অবলম্বন।

    বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার বেশি। বিবিএসের মজুরি সূচকে মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধির চিত্র উঠে আসে। শ্রমবাজারে এই শ্রেণির শ্রমিকের অংশ প্রায় ৮৫ শতাংশ।

    আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা দারিদ্র্যের সংকটকে আরও গভীর করছে।

    এমন বাস্তবতায় ১৭ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। বিশ্বব্যাপী চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্য দূর করতে জনসচেতনতা তৈরি করাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের প্রতিপাদ্য ‘শান্তি ও মানবাধিকারের জন্য ঐক্যবদ্ধ’। এ বছরের উপবিষয় ‘সবার জন্য নিরাপদ ঘর’। অথচ দেশের বহু মানুষের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

    দেশে দরিদ্র পাঁচ কোটির বেশি মানুষ

    বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে। ২০২২ সালে প্রকাশিত বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিবেচনায় ২০২৫ সালে দেশের জনসংখ্যা আনুমানিক ১৭ কোটি ৬১ লাখে পৌঁছায়। পিপিআরসির দারিদ্র্যের হার প্রয়োগ করলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার কোটি ৯২ লাখ।

    অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। সংস্থাটির হিসাবে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি ১৩ লাখে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দৈনিক তিন ডলারের কম ভোগব্যয় থাকলে একজন মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে বিবেচনা করা হয়।

    দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদেরা। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে, যে সময়ে দারিদ্র্য কমার কথা, সেই সময়ে টানা চার বছর ধরে দারিদ্র্য বাড়তে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর অর্থ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

    মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর মতে, দারিদ্র্য বিমোচন কেবল সরকারি পরিসংখ্যান কিংবা দিবসকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। মানুষের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। এ জন্য দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, বৈষম্য কমানো এবং প্রান্তিক মানুষের টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।

    চরম দারিদ্র্যে প্রায় এক কোটি ৭৮ লাখ মানুষ

    দেশে চরম দারিদ্র্যের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিবিএসের ২০২২ সালের জরিপে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। পিপিআরসির ২০২৫ সালের জরিপে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ১০ দশমিক ১ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

    এই হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় একজন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছেন। জনসংখ্যার ভিত্তিতে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৭৮ লাখ।

    পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুযায়ী, শুধু আয় কম হলেই দারিদ্র্য তৈরি হয় না। বাসস্থান, পুষ্টি, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবও মানুষকে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে ফেলে। এ ক্ষেত্রে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

    দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ছয় কোটি ২০ লাখ মানুষ

    বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ছয় কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যেকোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় তাঁদের দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

    বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। এ সময়ে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসেন। একই সময়ে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পান। তাঁদের জীবনমানের উন্নতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও পয়োনিষ্কাশনের মতো জরুরি সেবা পাওয়ার সুযোগও বেড়েছিল।

    তবে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমতে শুরু করে। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বিশ্বের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অবশ্য সেই অগ্রগতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

    বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি বড় কারণ

    দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও বহু মানুষের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে বেকারত্ব ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান যুক্ত হয়ে দারিদ্র্যের চাপ বাড়িয়েছে।

    অন্যদিকে, রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর। বাজারে পণ্য ও সেবার দাম যে হারে বাড়ছে, সে হারে বাড়ছে না মানুষের মজুরি। ফলে আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

    বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাবার ও বাসাভাড়ায়। এরপর শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে তাঁদের হাতে সঞ্চয়ের সুযোগ থাকে না। হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাঁদের ঋণগ্রস্ত করে তুলতে পারে।

    এ পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য মোকাবিলায় শুধু আর্থিক সহায়তা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বাড়ানো এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় মারুফ মজুমদারের মতো অসংখ্য মানুষের কাছে মাসের পর মাস টিকে থাকাই হয়ে উঠবে জীবনের প্রধান লড়াই।

    React:

    Leave a Comment

    Your email address will not be published.

    Theme by Jhinai Technologies