একটি সাধারণ কাঠামো, দুই পায়ের ছন্দ আর মাটির নিচের পানি। এই তিন জিনিস মিলেই একসময় বাংলাদেশের লাখো ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সেচের নতুন দরজা খুলেছিল। ঢেঁকিকল বা ট্রেডল পাম্প শুধু একটি কৃষিযন্ত্রের গল্প নয়, এটি উপযুক্ত প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র কৃষক, স্থানীয় কারিগরি দক্ষতা এবং বাজারভিত্তিক উন্নয়নের এক বিরল উদাহরণ।
বাংলাদেশের গ্রামে পানির সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ক বরাবরই অদ্ভুত। বর্ষায় পানি যেন অতিরিক্ত, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই পানিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সংকট। নদী, খাল, বিল আর ভূগর্ভস্থ পানির দেশে কৃষকের জমি কখনো পানিতে ডোবে, কখনো পানির অভাবে ফসল শুকিয়ে যায়।
বিশেষ করে আশির দশকের আগে ও শুরুর দিকে ছোট কৃষকের জন্য সেচের ব্যবস্থা ছিল বড় কৃষকের তুলনায় অনেক কঠিন। ডিজেলচালিত পাম্প বা গভীর নলকূপের পানি কিনতে হতো। যাদের নিজস্ব সেচযন্ত্র ছিল না, তাদের অনেক সময় জমিতে পানি দেওয়ার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতো।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষিতে হাজির হয় একটি আশ্চর্যরকম সাধারণ যন্ত্র। নাম ট্রেডল পাম্প, বাংলায় যার পরিচিত নাম ঢেঁকিকল।
বিদ্যুৎ নেই, ডিজেল নেই, বড় ইঞ্জিন নেই। শুধু দুই পা দিয়ে একটি কাঠামোর ওপর ওঠানামা করতে হয়। সেই ছন্দে পাম্পের পিস্টন ওঠানামা করে এবং মাটির নিচ থেকে পানি উঠে আসে।
যন্ত্রটি দেখতে যত সাধারণ, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল ততটাই বড়।
ঢেঁকিকল আসলে কী?
ট্রেডল পাম্প মূলত একটি মানবচালিত সাকশন পাম্প। সাধারণ মডেলে দুটি সিলিন্ডার থাকে। প্রতিটি সিলিন্ডারের ভেতরে পিস্টন থাকে এবং পিস্টনের সঙ্গে যুক্ত থাকে পায়ের চাপ দেওয়ার ব্যবস্থা।
কৃষক যখন এক পা দিয়ে একটি ট্রেডলের ওপর চাপ দেন, তখন একটি পিস্টন নড়ে। অন্য পা দিয়ে অপর ট্রেডলে চাপ দিলে দ্বিতীয় পিস্টন কাজ করে। এভাবে হাঁটার মতো ছন্দে দুই পিস্টন পর্যায়ক্রমে কাজ করতে থাকে।
ফলে মাটির নিচের অগভীর নলকূপ বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর থেকে পানি ওপরে উঠে আসে এবং সরু নালা বা পাইপের মাধ্যমে জমিতে পৌঁছায়।
এটি মূলত অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির জন্য কার্যকর। প্রচলিত নকশার সাকশন পাম্প সাধারণত প্রায় ৭ মিটার পর্যন্ত গভীরতা থেকে পানি তুলতে পারে। পানির স্তর যত গভীরে যায়, পাম্পের কার্যকারিতা তত কমে।
এই সীমাবদ্ধতাই আবার ঢেঁকিকলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটিকে স্পষ্ট করে। বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তুলনামূলক অগভীর ছিল। ফলে অল্প খরচের এই প্রযুক্তি ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছিল।
কে আবিষ্কার করেছিলেন ঢেঁকিকল?
কুড়িগ্রামের উলিপুরের নরেন্দ্রনাথ দেবকে এই যন্ত্রের উদ্ভাবক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে ঢেঁকিকলের উদ্ভাবক বলা হয়েছে। ১৯৭৭ সালে ট্রেডল পাম্প বা ঢেঁকিকল উদ্ভাবন করে রাষ্ট্রীয় পদক প্রাপ্ত হন এবং একটি বে-সরকারী সংস্থার ব্যয়ে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেপালসহ একাধিক দেশ ভ্রমণ করেন।
তার ওই উদ্ভাবন দেখে মুগ্ধ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীরা। তার আবিষ্কৃত ঢেঁকিকল শুধু বাংলাদেশে নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নেপাল, ভিয়েতনাম, ভারত ও থাইল্যান্ডের কৃষকরা ব্যবহার করছেন।
খাল কাটার কর্মসূচিতে এসে ১৯৭৯ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই পাম্প দেখতে আসেন। তিনি একটি পাম্পও কিনে নিয়ে যান।
তবে ইতিহাসে আরও কিছু তথ্য এই উদ্ভাবনের সাথে জড়িয়ে আছে। Rangpur-Dinajpur Rural Service বা RDRS-এর গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের নথি অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য কম খরচে সেচের উপায় খোঁজার কাজ শুরু হয়। নরওয়েজীয় কৃষি প্রকৌশলী Gunnar Barnes এই গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। RDRS-এর নথি অনুযায়ী, প্রথম কার্যকর twin-treadle pump নকশা তৈরি ও নির্মাণের সময় ছিল ১৯৮০ সালের নভেম্বর।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন উন্নয়ন সংস্থার প্রকৌশলী Dan Jenkins-সহ অন্যরাও নকশাটির উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। নরেন্দ্রনাথ দেবও স্থানীয়ভাবে পাম্প তৈরি ও এর উৎপাদন বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গবেষণা ও উন্নয়ন থেকে স্থানীয় উৎপাদন এবং পরে বাজারে ছড়িয়ে পড়া, পুরো প্রক্রিয়াটিই ঢেঁকিকলের ইতিহাসের অংশ।
অর্থাৎ এটিকে বলা যায় স্থানীয় প্রয়োজন, প্রকৌশল পরীক্ষা এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি একটি যৌথ উদ্ভাবন।
কেন এমন একটি পাম্পের প্রয়োজন হয়েছিল?
বাংলাদেশে ছোট কৃষকের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সেচের পানিতে প্রবেশাধিকার।
একজন বড় কৃষক হয়তো ডিজেলচালিত পাম্প কিনতে পারেন। কিংবা গভীর নলকূপের মালিক হতে পারেন। কিন্তু অল্প জমির কৃষকের কাছে কয়েকশ ডলার দামের পাম্প ছিল প্রায় অসম্ভব বিনিয়োগ।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র কৃষককে যদি শুধু পানি কিনে সেচ দিতে হয়, তাহলে ফসলের লাভের বড় অংশই চলে যায় সেচের খরচে।
ঢেঁকিকলের নকশা করা হয়েছিল ঠিক এই জায়গাটিকে মাথায় রেখে।
RDRS-এর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল এমন একটি পাম্প তৈরি করা, যার দাম ক্ষুদ্র কৃষকের নাগালের মধ্যে থাকবে এবং স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি ও মেরামত করা যাবে। প্রাথমিক নকশায় বাঁশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি কাঠামো এবং সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করা হতো।
অর্থাৎ প্রযুক্তির প্রথম শর্ত ছিল না এটি কতটা আধুনিক। প্রথম শর্ত ছিল, এটি যেন দরিদ্র কৃষক ব্যবহার করতে পারেন।
একটি পাম্প, একটি পরিবারের গল্প
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষক শামসুদ্দিন আহমেদের গল্প উঠে আসে।
জামালপুর বা ঢাকার আশপাশের গ্রামের মতোই বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট কৃষকের জীবন তখন ছিল জমি এবং দিনমজুরির মাঝামাঝি। আহমেদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ একর জমি ছিল। সেই জমিতে উৎপাদিত ধান দিয়ে ছয় সদস্যের পরিবারকে বছরে মাত্র কয়েক মাস চালানো সম্ভব হতো।
বাকি সময় তাঁকে কখনো নদীর ফেরিতে, কখনো অন্যের জমিতে দিনমজুরি করতে হতো।
পরে তিনি প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে একটি ঢেঁকিকল কিনে নিজের জমিতে বসান। পা দিয়ে চালানো সেই পাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে জমিতে দিতে শুরু করেন।
পুরোনো প্রতিবেদনে তাঁর পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কৃষকের নিজের ভাষায়, এটি ছিল তাঁর পরিবারের জন্য একটি ছোট আশ্চর্য।
এই ধরনের গল্পই ঢেঁকিকলের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝায়।
যন্ত্রটি কৃষককে শুধু পানি দেয়নি। এটি তাঁকে নিজের জমিতে কখন পানি দেবেন, কোন ফসল করবেন এবং কতটা জমি ব্যবহার করবেন, সে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা দিয়েছে।
বড় কৃষকের পাম্পের বিপরীতে ছোট কৃষকের ঢেঁকিকল
ঢেঁকিকল জনপ্রিয় হওয়ার একটি বড় কারণ ছিল এর মালিকানা।
বড় সেচব্যবস্থায় কৃষককে পানি কিনতে হয়। কিন্তু নিজের ঢেঁকিকল থাকলে কৃষক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি তুলতে পারেন।
তৎকালীন কৃষকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাতেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে। ঢেঁকিকল ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে সেচের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছিল। ফলে বড় জমির মালিক বা সেচযন্ত্রের মালিকের ওপর নির্ভরতা কমেছিল।
একজন কৃষকের ভাষায় বিষয়টি ছিল খুব সহজ: অন্যের নলকূপ থেকে পানি কিনতে হবে না, নিজের পাম্প থাকলে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দেওয়া যাবে।
এটি অর্থনীতির ভাষায় ছোট একটি পরিবর্তন। কিন্তু গ্রামের ক্ষমতার কাঠামোয় এর অর্থ ছিল অনেক বড়।
শুধু পাম্প বানালেই বিপ্লব হয় না
ঢেঁকিকলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।
একটি ভালো যন্ত্র আবিষ্কার করলেই তা লাখো মানুষের হাতে পৌঁছে যায় না।
১৯৮০-এর দশকে International Development Enterprises বা IDE ঢেঁকিকলকে বড় পরিসরে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নামে। তাদের কৌশল ছিল শুধু বিনামূল্যে পাম্প বিতরণ নয়। বরং একটি সম্পূর্ণ স্থানীয় বাজার তৈরি করা।
প্রায় ৭৫টি ছোট বেসরকারি ওয়ার্কশপকে পাম্প তৈরিতে যুক্ত করা হয়। স্থানীয় ডিলার তৈরি করা হয়। নলকূপ বসানো ও পাম্প স্থাপনের জন্য গ্রামীণ কারিগরদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিভিন্ন গবেষণায় কয়েক হাজার ডিলার ও ইনস্টলারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ঢেঁকিকলকে শুধু কৃষিযন্ত্র হিসেবে দেখা হয়নি।
এটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল একটি স্থানীয় শিল্পব্যবস্থা।
কেউ পাম্প বানাচ্ছেন, কেউ বিক্রি করছেন, কেউ নলকূপ বসাচ্ছেন, কেউ মেরামত করছেন। কৃষক কিনছেন। আবার কৃষক আয় করলে সেই আয় থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও অর্থ ফিরে আসছে।
এ কারণেই ঢেঁকিকলের গল্প আসলে প্রযুক্তির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির গল্পও।
গ্রামের বাজারে সিনেমা দিয়ে পাম্প বিক্রি
IDE-এর বিপণন কৌশলও ছিল সময়ের তুলনায় ব্যতিক্রমী।
শুধু পোস্টার, লিফলেট বা বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রামের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়নি। পাম্প চালিয়ে দেখানো হয়েছে। বাজারে প্রদর্শনী হয়েছে। স্থানীয় গান ও নাটকের মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।
এমনকি ট্রাকের ওপর প্রজেক্টর বসিয়ে গ্রামে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পাম্পকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছিল পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা গ্রামীণ দর্শকদের সামনে প্রদর্শিত হতো।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।
দরিদ্র মানুষকে শুধু প্রযুক্তির সুবিধা বোঝানো নয়, তাদের গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
তারা দান গ্রহণকারী নয়, তারা ক্রেতা।
এই ধারণাই ঢেঁকিকলকে বড় বাজারে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
কত কৃষকের হাতে পৌঁছেছিল?
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ কৃষকের হাতে ঢেঁকিকল পৌঁছে যাওয়ার কথা সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে। পরে IDE-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১২ থেকে ১৫ বছরের সময়কালে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ ঢেঁকিকল কৃষকের কাছে বিক্রি হয়েছিল।
FAO-র একটি পর্যালোচনাতেও ২০০০ সালের আশপাশে বাংলাদেশে ১৩ লাখের বেশি ঢেঁকিকল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে বিভিন্ন সময়ের গবেষণায় সংখ্যার পার্থক্য আছে। কারণ কোনো গবেষণা বিক্রিত পাম্প গুনেছে, কোনোটি সক্রিয় পাম্প বা কৃষক পরিবারের হিসাব করেছে।
তাই নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা দিয়ে পুরো ইতিহাসকে বেঁধে ফেলার চেয়ে বলা নিরাপদ যে আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছিলেন।
কৃষকের আয় কতটা বাড়িয়েছিল?
IWMI-এর একটি বহুল উদ্ধৃত গবেষণায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঢেঁকিকল ব্যবহারকারী কৃষকদের আয় ও কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণাটিতে দেখা যায়, ঢেঁকিকল ব্যবহারকারী পরিবারের বার্ষিক নিট আয় বৃদ্ধির পরিমাণ পরিবার ও অঞ্চলের ওপর নির্ভর করলেও প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারকে একটি রক্ষণশীল গড় হিসাব হিসেবে ধরা যায়। বিভিন্ন পরিবারের ক্ষেত্রে প্রভাব ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত।
আয় বৃদ্ধির কারণ শুধু ধানের ফলন বাড়া নয়।
সেচের সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষক শুষ্ক মৌসুমে সবজি, গম, মরিচ, টমেটো, বাঁধাকপি, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতে পারতেন। ফলে জমির ব্যবহার বেড়েছে এবং বছরে একাধিক ফসল নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১৯৯১ সালের RDRS প্রকাশনাতেও বলা হয়েছিল, ঢেঁকিকলের ব্যবহার অনেক এলাকায় cropping intensity বাড়িয়েছে এবং নতুন ধরনের সবজি চাষের সুযোগ তৈরি করেছে। নারী ও শিশুরাও পাম্প পরিচালনায় অংশ নিত।
ধানের পাশাপাশি সবজির বিপ্লব
ঢেঁকিকলের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত শুধু ধানের জমিতে নয়, ছোট আকারের উচ্চমূল্যের ফসলে।
একজন কৃষকের হাতে যদি অল্প জমি থাকে এবং বড় সেচযন্ত্র কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে সেই জমিতে কম খরচে পানি দিয়ে শাকসবজি চাষ করা তার জন্য তুলনামূলক লাভজনক হতে পারে।
এই কারণেই ঢেঁকিকল অনেক জায়গায় ক্ষুদ্র কৃষিকে বাণিজ্যিক কৃষির দিকে নিয়ে যায়।
কৃষক শুধু পরিবারের খাবার উৎপাদন করছেন না। তিনি বাজারে বিক্রির জন্য ফসল উৎপাদন করছেন।
একটি ছোট পাম্প তাই জমির আকার না বাড়িয়েও কৃষকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
কেন সবাই ঢেঁকিকল ব্যবহার করেনি?
ঢেঁকিকলের সীমাবদ্ধতাও ছিল।
প্রথমত, এটি মানুষের শারীরিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময় পা দিয়ে পাম্প চালানো কঠিন।
দ্বিতীয়ত, এর পানি তোলার ক্ষমতা মোটরচালিত পাম্পের তুলনায় কম।
তৃতীয়ত, এটি অগভীর পানির স্তরের জন্য বেশি উপযোগী। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেলে এর কার্যকারিতা কমে যায়।
চতুর্থত, বড় বোরো ধানের জমিতে বিপুল পরিমাণ পানি দেওয়ার জন্য ঢেঁকিকল সবসময় যথেষ্ট নয়। ১৯৯৪ সালের একটি গবেষণায়ও পাম্প পরিচালনার শারীরিক কষ্টকে বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং কম পানিনির্ভর ফসলের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল।
বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ইতিহাসে পরে ছোট ডিজেলচালিত পাম্প, শ্যালো টিউবওয়েল এবং অন্যান্য সেচপ্রযুক্তি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেক কৃষকের কাছে ঢেঁকিকল হয়ে ওঠে একটি প্রথম ধাপের প্রযুক্তি।
অর্থাৎ যে কৃষক প্রথমে নিজের পায়ে পানি তুলেছিলেন, আয় বাড়ার পর তিনি হয়তো মোটরচালিত পাম্প কেনার সামর্থ্য অর্জন করেছেন।
এই অর্থে ঢেঁকিকল শুধু শেষ গন্তব্য ছিল না। অনেকের জন্য এটি ছিল যান্ত্রিক সেচের পথে প্রবেশদ্বার।
পানির নিরাপত্তার প্রশ্নও আছে
ঢেঁকিকল দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যায় বলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানযোগ্য বা নিরাপদ, এমন ধারণা ঠিক নয়।
বাংলাদেশের অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণের সমস্যা রয়েছে। ২০০৩ সালের একটি গবেষণায় ছয়টি জেলার ১২২টি ঢেঁকিকল থেকে তোলা পানির নমুনা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিল। গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়, পরীক্ষিত পাম্পগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বাংলাদেশের তৎকালীন পানযোগ্যতার মানের ওপরে ছিল।
তাই ঢেঁকিকলকে সেচযন্ত্র হিসেবে দেখলে একরকম, আর পানীয় জলের উৎস হিসেবে দেখলে আরেকরকম সতর্কতা প্রয়োজন।
সেচের জন্য ব্যবহৃত পানি নিরাপদ পানীয় পানি কিনা, তা পরীক্ষা ছাড়া ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের অন্য দেশে
ঢেঁকিকলের গল্প বাংলাদেশের সীমানায় থেমে থাকেনি।
আশির দশক থেকেই প্রযুক্তিটি ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও মানবচালিত পাম্পের নকশা ও ধারণা ব্যবহার করা হয়।
FAO-এর একটি পর্যালোচনায় ঢেঁকিকলকে ক্ষুদ্র কৃষকের সেচ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাকে উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে প্রযুক্তি বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা হয়।
তবে অন্য দেশে গিয়ে একই পাম্প সবসময় একই ফল দেয়নি। কারণ প্রযুক্তির সাফল্য নির্ভর করে পানির গভীরতা, জমির ধরন, ফসল, শ্রমের মূল্য, স্থানীয় কারিগরি দক্ষতা এবং বাজারব্যবস্থার ওপর।
অর্থাৎ কোনো প্রযুক্তি শুধু তার নকশার কারণে সফল হয় না। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল থাকতে হয়।
ঢেঁকিকলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
ঢেঁকিকলের ইতিহাস থেকে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার।
প্রযুক্তি মানেই জটিল যন্ত্র নয়।
কখনো কখনো সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তি হলো এমন একটি যন্ত্র, যা গ্রামের একজন কারিগর বানাতে পারেন, একজন কৃষক কিনতে পারেন, একজন কৃষকের পরিবারের সদস্যরা চালাতে পারেন এবং নষ্ট হলে স্থানীয় মিস্ত্রি মেরামত করতে পারেন।
ঢেঁকিকল ঠিক সেই দর্শনের ওপর দাঁড়িয়েছিল।
এটির জন্য বিদ্যুৎ দরকার হয়নি। ডিজেল দরকার হয়নি। বড় কারখানা দরকার হয়নি। বিদেশি প্রকৌশলী এসে প্রতিটি পাম্প মেরামত করে দিতে হয়নি।
স্থানীয় কৃষক, স্থানীয় কারিগর এবং স্থানীয় বাজারই হয়ে উঠেছিল প্রযুক্তিটির অবকাঠামো।
আজকের বাংলাদেশে ঢেঁকিকলের জায়গা কোথায়?
আজকের বাংলাদেশ আশির দশকের বাংলাদেশ নয়।
দেশে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, বৈদ্যুতিক পাম্প, শ্যালো টিউবওয়েল, গভীর নলকূপ এবং সৌরচালিত পাম্পের ব্যবহার বেড়েছে। কৃষিও অনেক বেশি যান্ত্রিক হয়েছে।
তবু ঢেঁকিকলের ধারণাটি পুরোনো হয়ে যায়নি।
কারণ আজও বাংলাদেশের এমন অনেক কৃষক আছেন যাদের জমি ছোট, মূলধন সীমিত এবং সেচের প্রয়োজন স্থানীয় ও মৌসুমি।
আর জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে যখন একদিকে অতিবৃষ্টি, অন্যদিকে খরা, তখন ছোট আকারের বিকেন্দ্রীভূত সেচব্যবস্থার প্রয়োজন নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে।
ঢেঁকিকল হয়তো আর বাংলাদেশের কৃষির প্রধান সেচযন্ত্র নয়। কিন্তু এর দর্শন এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
কম খরচে, স্থানীয় উপকরণে, স্থানীয় শ্রমে, স্থানীয় সমস্যার সমাধান।
একটি ছোট যন্ত্রের বড় উত্তরাধিকার
ঢেঁকিকলের গল্প শেষ পর্যন্ত একটি পাম্পের গল্প নয়।
এটি দেখায়, উন্নয়ন কখনো কখনো ওপর থেকে নিচে আসে না। কোনো বিশাল প্রকল্প, বড় বাঁধ বা কোটি টাকার অবকাঠামো ছাড়াও পরিবর্তন শুরু হতে পারে গ্রামের একজন কৃষকের জমি থেকে।
একজন কৃষক নিজের জমিতে পানি তুললেন।
তারপর তিনি আরেকটি ফসল ফলালেন।
পরিবারের খাদ্যসংকট কিছুটা কমল।
অতিরিক্ত ফসল বাজারে বিক্রি হলো।
কেউ পাম্প বানানোর কাজ পেলেন।
কেউ পাম্প বিক্রি করলেন।
কেউ নলকূপ বসালেন।
কেউ মেরামতের কাজ শিখলেন।
একটি ছোট যন্ত্রকে ঘিরে তৈরি হলো একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
এই কারণেই বাংলাদেশের ঢেঁকিকল কৃষি-প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে আছে।
এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো পানি তোলার ক্ষমতায় নয়।
সাফল্য ছিল পানির ওপর কৃষকের নিজের অধিকার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোয়।
একসময় যে কৃষক অন্যের পাম্পের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, তিনি নিজের দুই পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের জমিতে পানি তুলতে শুরু করলেন।
আর সেই দৃশ্যটিই ঢেঁকিকলের আসল গল্প।
একটি পাম্প, দুই পা, আর মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা পানি। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কখনো কখনো বড় পরিবর্তনের শুরু এতটাই সাধারণ হতে পারে।
১. RDRS Bangladesh, The Treadle Pump: Manual Irrigation for Small Farmers in Bangladesh, 1991.
২. IWMI (International Water Management Institute), Pedaling out of Poverty: Social Impact of a Manual Irrigation Technology in South Asia, 2000.
৩. FAO (Food and Agriculture Organization of the United Nations), Small-scale Irrigation for Rural Development, সংশ্লিষ্ট অধ্যায় ও প্রযুক্তি পর্যালোচনা।
৪. International Development Enterprises (iDE), বাংলাদেশে ট্রেডল পাম্পের উন্নয়ন, স্থানীয় উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণসংক্রান্ত নথি।
৫. Rangpur-Dinajpur Rural Service (RDRS), ট্রেডল পাম্পের নকশা, মাঠপর্যায়ের ব্যবহার ও কৃষি প্রভাবসংক্রান্ত গবেষণা ও প্রকাশনা।
৬. Los Angeles Times, “The Treadle Pump: A Simple Device Helps Bangladesh’s Poor Farmers”, 16 April 1995.
৭. Arsenic contamination in shallow aquifer in Bangladesh: A treadle pump lifted water based study, Bangladesh-এর অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক সংক্রান্ত গবেষণা।
৮. Development literature on Gunnar Barnes, RDRS and the treadle pump, ট্রেডল পাম্পের প্রাথমিক নকশা ও উন্নয়নসংক্রান্ত গবেষণা।
৯. Bangladesh Agricultural Research Council (BARC), বাংলাদেশের ক্ষুদ্র সেচ ও কৃষি প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা ও তথ্য।




