নয়ন আসাদ ।। কৈশোর মানেই একসময় ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি বাইরে ছুটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, নানা ধরনের খেলায় মেতে ওঠা। স্কুল ছুটির পর বাড়িতে ফেরার আগে কিংবা বিকেলের কোনো একসময় খেলার সুযোগ তৈরি হতো। কারও পছন্দ ফুটবল, কারও ক্রিকেট, কেউ দৌড়ঝাঁপ বা অন্য কোনো খেলায় ব্যস্ত থাকত। খেলাধুলার মধ্য দিয়েই তৈরি হতো বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা, আনন্দ আর শৈশব-কৈশোরের অসংখ্য স্মৃতি।
কিন্তু এখন অনেক কিশোর-কিশোরীর দিনের হিসাব থেকে সেই সময়টুকুই যেন হারিয়ে গেছে। তাদের দিনের বড় অংশজুড়ে পড়াশোনা, স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট পড়া, বাড়ির কাজ এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি। সবকিছুর কেন্দ্রে একটি লক্ষ্য, ভালো ফল করতে হবে।
ঘুম থেকে ওঠার পরই শুরু হয় দিনের ব্যস্ততা। সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত কিছুটা পড়াশোনা। এরপর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি। বই-খাতা গুছিয়ে স্কুলের উদ্দেশে বের হওয়া। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে পাঠ, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা বিভিন্ন শিক্ষাক্রমের ব্যস্ততা।
স্কুল শেষে অনেকের দিনের পড়াশোনা শেষ হয় না। বাড়িতে ফেরার পর কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকলেও অপেক্ষা করে কোচিং কিংবা প্রাইভেট শিক্ষক। কোথাও এক বিষয়ের ক্লাস, কোথাও একাধিক বিষয়ের পড়া। দিনের যে সময়টুকু একসময় নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগ ছিল, সেটিও এখন অনেকের কাছে আরেক দফা পড়াশোনার সময়।
এরপর বাড়িতে ফিরেও শেষ হয় না ব্যস্ততা। স্কুলের পড়া শেষ করা, কোচিংয়ের কাজ করা, পরদিনের প্রস্তুতি নেওয়া, পরীক্ষার পড়া এগিয়ে রাখা। একেকটি দিনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে পরের দিনের প্রস্তুতি।
ফলে খেলাধুলার জন্য আলাদা করে সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভালো ফলের চাপ
কৈশোরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক পরিবারের কাছে ভালো ফলাফল যেন সন্তানের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন অবস্থানে থাকল, কোন স্কুল বা কলেজে সুযোগ পেল, অন্যদের তুলনায় কতটা এগিয়ে থাকল, এসব প্রশ্নের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন চাপ।
অভিভাবকের প্রত্যাশা, শিক্ষকের চাপ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন হয়ে উঠছে ফলাফলকেন্দ্রিক।
ফলে খেলাধুলাকে অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজ হিসেবে দেখা হয় না। বরং খেলার সময়কে পড়াশোনার ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বই খুলে বসা মানেই সময়ের সঠিক ব্যবহার, আর মাঠে যাওয়া মানেই সময় নষ্ট, এমন একটি ধারণা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে।
কেউ হয়তো খেলতে চায়। কিন্তু তাকে বলা হয়, আগে পড়া শেষ করো। পরীক্ষার পর খেলবে। এই পরীক্ষার পর, পরের পরীক্ষার পর, বার্ষিক পরীক্ষার পর। একসময় দেখা যায়, খেলার সেই সময় আর ফিরে আসে না।
বিকেলটাও যখন পড়ার
একটি শিশুর বা কিশোরের দিনের সবচেয়ে স্বাভাবিক অবসর সময় হতে পারে বিকেল। স্কুল শেষে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বাইরে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া, দৌড়ানো কিংবা কোনো খেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা।
কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে বিকেল শুরু হয় বই-খাতা দিয়ে।
কেউ কোচিংয়ে যায়, কেউ প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে। কেউ আবার বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করে। যাদের কোচিং নেই, তাদেরও থাকতে পারে স্কুলের কাজ, বাড়ির কাজ কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি।
ফলে দিনের এমন একটি সময়, যখন শরীর ও মন দুটিই একটু মুক্তভাবে চলাফেরা করার সুযোগ পেতে পারত, সেটিও চলে যাচ্ছে পড়াশোনার দখলে।
খেলা শুধু খেলা নয়
খেলাধুলাকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখলে এর গুরুত্বকে ছোট করে দেখা হয়। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর শরীর সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে তৈরি হয় দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস, নিয়ম মানার মানসিকতা, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার ক্ষমতা এবং অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা।
কোনো খেলায় জয় যেমন আনন্দ দেয়, পরাজয়ও শেখায় কীভাবে আবার চেষ্টা করতে হয়। নিজের ভুল বুঝে সংশোধন করা, অন্যকে সহযোগিতা করা, প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে সামলে রাখা, নেতৃত্ব দেওয়া কিংবা প্রয়োজনে নেতৃত্ব মেনে নেওয়া, এসব অভিজ্ঞতা শুধু বই পড়ে অর্জন করা কঠিন।
খেলার মাঠে শিশুরা নিজেদের মতো করে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগও পায়। সেখানে বয়সী অন্যদের সঙ্গে কথা বলা, মতের অমিল সামলানো, নিয়ম তৈরি করা কিংবা কোনো বিষয়ে একমত হওয়া, সবই তাদের সামাজিক বিকাশের অংশ।
মাঠ আছে, সময় নেই
খেলার জায়গা কমে যাওয়া অবশ্যই একটি বড় সমস্যা। শহরে খেলার মাঠের সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক এলাকায় মাঠ থাকলেও সেখানে নানা ধরনের ব্যবহার তৈরি হয়েছে। কোথাও নির্মাণকাজ, কোথাও বাজার, কোথাও পার্কিং কিংবা অন্য কোনো কাজে জায়গাটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে শুধু মাঠের সংকট দিয়েই পুরো সমস্যাটিকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অনেক জায়গায় খেলার জন্য কিছুটা জায়গা থাকলেও শিশুর হাতে সময় নেই। পড়াশোনার চাপ, কোচিং, প্রাইভেট এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি তাদের দিনের অবসরটুকু কমিয়ে দিচ্ছে।
অর্থাৎ কোথাও সমস্যা মাঠের, কোথাও সময়ের, আবার কোথাও পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গির।
রাতেও শেষ হয় না পড়া
দিনের শেষে যখন বিশ্রামের সময় হওয়ার কথা, তখনও অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চলতে থাকে।
পরদিনের ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে রাত পর্যন্ত পড়তে হয়। একটি অধ্যায় শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘুমানোর সুযোগ নেই। কখনো আবার পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ঘুমের সময়ও কমে আসে।
এভাবে পরদিন আবার একই রুটিন।
সকালে ঘুম থেকে ওঠা, স্কুলে যাওয়া, স্কুল শেষে পড়াশোনা, আবার পড়াশোনা, রাতে পড়াশোনা। মাঝখানে খেলাধুলা বা নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়।
একসময় শিশুটি হয়তো নিজেই ধরে নেয়, খেলার জন্য সময় বের করা তার জীবনের অগ্রাধিকার নয়।
শৈশবের জায়গায় শুধু ফলাফল?
প্রশ্ন হলো, একটি শিশুর ভালো ফলাফল কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তার বিনিময়ে আমরা তার কাছ থেকে কী চাইছি?
ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু একটি শিশুর বেড়ে ওঠা শুধু পরীক্ষার খাতার নম্বর দিয়ে মাপা যায় না।
তার শরীরের বিকাশ আছে, মানসিক বিকাশ আছে, সামাজিক বিকাশ আছে। আছে আনন্দ করার প্রয়োজন, নিজের মতো করে কিছু করার প্রয়োজন এবং সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার প্রয়োজন।
শিক্ষার লক্ষ্য যদি একটি শিশুকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হয়, তাহলে সেই প্রস্তুতিতে শুধু বই ও পরীক্ষা থাকবে না। থাকবে শরীরচর্চা, খেলাধুলা, বিশ্রাম, সামাজিকতা এবং নিজের জন্য কিছুটা সময়।
খেলাধুলার সময় ফিরিয়ে আনা দরকার
শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করতে শুধু মাঠ বানালেই হবে না। তাদের সময়ও তৈরি করতে হবে।
স্কুলে শারীরিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ কমানো, নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ রাখা এবং পরিবারের মধ্যে খেলাধুলাকে সময় নষ্ট হিসেবে না দেখার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি।
প্রতিটি শিশুকে খেলোয়াড় হতে হবে, এমন নয়। প্রতিদিন কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে, তাও নয়। প্রয়োজন হলো শরীর ও মনকে স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় রাখার সুযোগ।
কারণ কৈশোর জীবনের এমন একটি সময়, যা পরে ফিরে আসে না।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে, ভালো কলেজে যেতে পারে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে। কিন্তু তার কৈশোরের বিকেলগুলো ফিরে আসবে না। বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, নিজের মতো করে দৌড়ানো, কোনো খেলায় হার-জিতের আনন্দ, এসবও জীবনের শিক্ষার অংশ।
তাই শিশুর হাতে শুধু বই তুলে দিয়ে তার ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায় না। তার হাতে কিছুটা অবসরও দিতে হয়। দিতে হয় চলাফেরার সুযোগ। দিতে হয় খেলার সময়।
কারণ একজন শিশুর জীবনে ভালো ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভালোভাবে বেড়ে ওঠাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।




