তাসমিয়া তাবাসসুম ।।
অ্যালোভেরা একটি অতীব পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ। বাড়ির ছাদবাগানে, বারান্দায়, কার্নিশে, ঘরের অন্দরসজ্জায় শোভা পায় অ্যালোভেরা। ঘরের দূষিত বায়ু থেকে রাসায়নিক পদার্থগুলো শুষে নিয়ে বায়ুকে পরিষ্কার রাখে। এটি ঘৃতকুমারী নামেও পরিচিত। ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরা সর্বজন বিদিত স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্য চর্চার প্রসাধনী হিসেবে বহুলব্যবহৃত উদ্ভিদ।
সম্পূরক খাদ্য হিসেবেও এর ব্যবহার ব্যাপক। এর ফুল সহজে দেখা যায় না। উদ্ভিদের বয়স তিন চার বছর হয়ে গেলে তখন ফুল দেখা যায়। লম্বা নলের ডগায় চিকন ফাঁপা ঝাকরবাতির মতো ফুল। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা পাথরকুচি উদ্ভিদের ফুলের মতো।
অ্যালোভেরা নামকরণের পেছনে একটি মজার লোককাহিনী জড়িয়ে আছে। মিশরীয় লোককাহিনীতে এ সম্পর্কে উল্লেখ আছে যে, সৌন্দর্যবর্ধন করে যে প্রকৃতিকণ্যা তার লাতিন নাম অ্যালোভেরা, যার অর্থ ঘৃতকুমারী। আর এই অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারীই হলো মিশরের টলেমি রাজবংশের সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার ত্বকের সৌন্দর্যের গোপন রহস্য। আরো জানা যায় যে ক্রিস্টোফার, কলম্বাস, সম্রাট আলেকজান্ডার, বাদশাহ সোলায়মান, নেপোলিয়নের মতো বিখ্যাত মানুষেরা তখনকার সময়ে তাদের সৌন্দর্য চর্চায় অ্যালোভেরা ব্যবহার করতেন। সেই থেকে আজ অব্দি অ্যালোভেরার ব্যবহারের ক্ষেত্র বেড়েই চলেছে।
এটি দেখতে অনেকাংশে কাঁটাওয়ালা ফণীমনসা বা ক্যাকটাসের মতো লাগে। দেখতে ক্যাকটাসের মতো হলেও এটি লিলি পরিবারের উদ্ভিদ। অ্যালোভেরা উদ্ভিদের গোড়া থেকে সবুজ রঙের মাংশল পাতা বের হয়। পাতাগুলো বেশ পুরু হয় এবং পাতার দুই পাশেই করাতের মতো ছোট ছোট কাঁটা থাকে। পাতার অগ্রভাগ দেখতে খানিকটা বর্শার সুচালো অগ্রভাগের মতো। পাতার ভেতরে থাকে স্বচ্ছ ও পিচ্ছিল ধরনের শাঁস। এই পিচ্ছিল শাঁসকে অ্যালোভেরা জেল বলা হয়।
অ্যালোভেরা উদ্ভিদের গোড়া থেকে কুঁড়ি জন্মায়। পৃথিবীতে প্রায় ২৫০ রকমের অ্যালোভেরার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে সবগুলো চাষ হয়না। বেশিরভাগই বুনো অ্যালোভেরা। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয় মাত্র ২ প্রকারের অ্যালোভেরা। বাণিজ্যিক ভাবে এর চাষ হলেও সৌখিন বাগানের টবেও এর অবস্থান লক্ষণীয়। তবে এর উপকার সম্পর্কে অনেকে জানলেও এর চাষ সম্পর্কে জানে না। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের বাগানে শোভা পায় না অতীব জরুরি উদ্ভিদ অ্যালোভেরা। তাহলে জেনে নেয়া যাক টবে অ্যালোভেরা চাষ সম্পর্কে।
টবে ঘৃতকুমারী চাষের প্রক্রিয়া
অ্যালোভেরা চাষের প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ। টবে করে ছোট পরিসরের ছাদ বাগান বা বাণিজ্যিক উভয়ভাবেই এর চাষ করা হয়। এর চাষ সহজ হলেও দীর্ঘসময়ের প্রয়োজন হয়। যার ফলে বাণিজ্যিকভাবে অ্যালোভেরা চাষের আগ্রহ পায়না চাষীরা। তবে ছাদবাগান বা ইনডোর প্ল্যান্টের তালিকার শুরুতেই স্থান পায় অ্যালোভেরা।
উপযোগী মাটি
প্রায় সবধরনের মাটিই অ্যালোভেরা চাষের জন্য উপযোগী। তবে দোঁ-আশ ও অল্প বালি মিশ্রিত মাটিতে অ্যালোভেরা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ভালো হয়। যেসকল জমির নিষ্কাশন ক্ষমতা ভালো বা পানি জমে না এরূপ উঁচু জমিতে অ্যালোভেরার চাষ করা সবচেয়ে উত্তম। সবচেয়ে অনুপযোগী মাটি হলো লবণাক্ত ও চরম অম্লীয় মাটি। এই মাটিতে অ্যালোভেরা উদ্ভিদ পচে যায়। এছাড়া নিচু ও পানি জমা জমিতেও গোড়া পচে গিয়ে এটি মরে যায়। ছায়াযুক্ত জায়গায় ঘৃতকুমারীর চাষ সম্ভব না এর জন্য দরকার সারা দিনের সরাসরি সূর্যলোক।
মাটি তৈরি
অ্যালোভেরা চাষ করতে হলে নির্বাচিত বেলে দোঁ-আশ মাটি নিয়ে প্রথমে ভালোভাবে পরিষ্কার করে ভেঙে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। মাটির সাথে গোবর বা জৈব পদার্থ মিশিয়ে দিতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে যারা অ্যালোভেরা চাষ করে তারা সাধারণত বেশি করে গোবর সার দিয়ে এর চাষ করে। খুব কম চাষি রয়েছে যারা রাসায়নিক সার ব্যবহার করে। অনেকেই আবার প্রচুর ছাই ব্যবহার করে থাকে। জৈব সার বা গোবর সার মেশানোর পর টবে চারা লাগানোর জন্য বেড তৈরি করতে হবে।
চারা রোপণ
ঘৃতকুমারী উদ্ভিদ দুইভাবে বংশবিস্তার করতে পারে। শেকড় ও ডাটার মাধ্যমে। মূলত শেকড়ের মাধ্যেমে বংশবিস্তারই বেশি ঘটতে দেখা যায়। শেকড় থেকে লম্বা ডাল বের হয়। বেরোনো ডাল কেটে নিয়ে অন্যত্র রোপণ করলে নতুন চারা গাছের জন্ম হয়। ঘৃতকুমারী উদ্ভিদ চাষের জন্য তিন ধরনের চারা লাগানো হয়। এগুলো হলো রুট সাকার বা মোথা, গাছের গোড়া থেকে গজানো চারা ও গাছের গোড়ার অংশ কেটে ফেলে পুরো গাছ।
ছাদবাগানে বা ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে গাছের গোড়া কেটে ফেলে দিয়ে পুরো গাছ লাগানো হয়। বাণিজ্যিকভাবেও রুট সাকার লাগানো অলাভজনক হওয়ায় এটি লাগানো হয় না। পুরানো গাছের গোড়া থেকে গজানো চারা লাগানো হয় বা মোথা কেটে পুরো গাছ লাগানো হয়। মাতৃগাছ বেশ বয়ষ্ক হয়ে গেলে এর গোড়া থেকে নতুন চারা গাছ জন্মায়। তখন মাতৃগাছ থেকে চারাগাছ আলাদা করে টবে লাগাতে হবে।
চারা লাগানোর পর দুই থেকে তিন মাস চারার পরিচর্যা করতে হবে। চারা একটু বড়ো হলে নতুন টবে স্থানান্তর করতে হবে। এভাবে রোপণ করা হলে চারার প্রতিষ্ঠা খুব ভালো হয়। তবে এরূপ চারা লাগিয়ে অ্যালোভেরার পাতা তোলার জন্য দীর্ঘ ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে।
চাইলে সরাসরি নার্সারি থেকে চারা নিয়েও লাগানো যায়। আর বাণিজ্যিক চাষের জন্য মাতৃগাছ থেকে চারা লাগানোর চেয়ে মোথা কেটে বাদ দিয়ে সরাসরি পুরনো গাছ লাগাতে হবে। এতে দ্রুত সময়ের মধ্যে পাতা তোলা যাবে।
গাছ লাগানোর তিন মাসের মাথায় পাতা তোলা যায়। দীর্ঘদিন টবে গাছ থাকার পর বারবার পাতা তুলতে তুলতে গাছের গোড়া লম্বা হয়ে যায়। তখন গাছ আর খাড়া হয়ে থাকতে পারে না। বাঁকিয়ে যায় আর মাটির সাথে নুয়ে লেগে যায়। তখন গাছ কেটে গোড়া থেকে ২/৩টি পাতা বাদ দিয়ে আবার নতুন করে গাছ লাগাতে হবে। লাগানো গাছের নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে যাতে গাছ সুস্থ সবল হয়ে বেড়ে ওঠে।
রোপণের সময়
অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী বছরের যেকোনো সময়েই চাষ করা যায়। তবে জুন মাস বা আষাঢ় মাসে গাছ লাগানো হলে তা অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ে। শীত কিংবা বর্ষাকালে চারা না লাগানোই ভালো। শীতের সময় বাজারে অ্যালোভেরার চাহিদা কম থাকে। কার্তিক বা অগ্রহায়ণ মাসে চারা লাগাতে হবে। বসন্তে নতুন পাতা ছাড়তে শুরু করবে এর কিছুদিন পরে পাতা সংগ্রহ করা যাবে। এ পদ্ধতিতে চাড়া রোপণ করলে বেশি পাতা পাওয়া যায়।
খাদ্যগুণে সমৃদ্ধ অ্যালোভেরা
অ্যালোভেরা উদ্ভিদ বিভিন্ন প্রকার খাদ্যগুণে সমৃদ্ধ। মানবদেহের প্রয়োজনীয় ২২টি এমিনো অ্যাসিডের ৮টি এর মধ্যে বিদ্যমান। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন A, B1, B2, B6, B12, C, E এবং বিটা ক্যারোটিন রয়েছে। এছাড়াও এতে আছে বিভিন্ন ধরণের খনিজ লবণ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, ক্রোমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক, কপার, এবং আয়রন।
ঔষধি গুনাগুন
অ্যালোভেরার ঔষধি ব্যবহার সেই প্রাচীনকাল থেকেই। ভেষজগুণের জন্য সর্বাধিক পরিচিত একটি উদ্ভিদ। এর জেলের বেশ কয়েকটি নিরাময় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যুগযুগ ধরে রূপচর্চায় এটি অন্যতম একটি আয়ুর্বেদিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি ত্বকের জ্বালা-পোড়া এবং কাটাকে ঠাণ্ডা করে।
এর মাংসল পাতার ভেতরে থাকা জেল খেলে শরীরের হজম শক্তি বাড়ে ও দেহের ওজন কমে। ডায়েরিয়া হলে ঘৃতকুমারীর রস খেলে দ্রুতই ডায়রিয়া সেরে যায়। পরিপাকতন্ত্র সতেজ রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এর তুলনা অপরিসীম। এর রস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আমাদের হৃদপিণ্ড ভালো রাখে এবং দেহকে বিষমুক্ত রাখে। এছাড়াও ত্বকের যত্নে এর ব্যবহার অপরিহার্য। ব্রণের সমস্যায় এর রস দারুণ উপকারী। বিভিন্ন প্রসাধনীতে এর ব্যবহার অভাবনীয় মাত্রায় দেখা যায়।
ছাদবাগানের একটি অন্যতম উদ্ভিদ অ্যালোভেরা। বৃক্ষপ্রেমীদের শখের বাগানে উদ্ভিদের তালিকার শীর্ষে থাকে।




