জমি কিনেছেন। দলিলও হয়েছে। টাকা পরিশোধ করে জমির দখলও বুঝে নিয়েছেন। কাগজপত্র দেখে আপনার কাছে জমিটি পুরোপুরি আপনারই মনে হতে পারে।
কিন্তু সরকারি খতিয়ানে যদি এখনো আগের মালিকের নাম থাকে, তাহলে আপনার জমির মালিকানা-তথ্য পুরোপুরি হালনাগাদ হয়নি।
এই জায়গাতেই আসে নামজারি বা মিউটেশন।
জমি কেনা, উত্তরাধিকার, হেবা, আদালতের ডিক্রি, নিলাম কিংবা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে ভূমির মালিকানা অর্জনের পর সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াই নামজারি। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম তোলা কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী তার নামে নতুন খতিয়ান খোলাই হলো নামজারি।
আর এখন এর জন্য বারবার ভূমি অফিসে ছুটতে হবে না। ঘরে বসেই করা যায় ই-নামজারির আবেদন।
শুধু জমি কিনলেই মালিকানা শেষ নয়
জমির দলিল হাতে থাকা আর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নাম থাকা এক বিষয় নয়। নামজারি হলে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ হয়। একই সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, জরিপ, ভবিষ্যতে জমি হস্তান্তর এবং মালিকানা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজেও সুবিধা হয়।
নামজারি না থাকলে ভবিষ্যতে জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা কিংবা একই জমি নিয়ে একাধিক দাবির মতো জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
তাই জমি কেনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হওয়া উচিত—
“আমার নামে নামজারি হয়েছে তো?”
নামজারি আসলে তিনভাবে হতে পারে
নামজারির ক্ষেত্রে জমির অবস্থা অনুযায়ী প্রক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে।
শুধু নামপত্তন: একই খতিয়ানে আগের মালিকের পরিবর্তে নতুন মালিক বা উত্তরাধিকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা।
নামপত্তন ও জমাখারিজ: জমি ভাগ হয়ে নতুন মালিকের নামে পৃথক খতিয়ান ও হোল্ডিং খোলা হলে।
নামপত্তন, জমাখারিজ ও একত্রীকরণ: একই মৌজায় একাধিক খতিয়ানের জমি একত্র করে নতুন খতিয়ান প্রস্তুত করা হলে।
এবার আবেদন হবে ঘরে বসেই
ই-নামজারির আবেদন করতে প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন সিস্টেমে প্রবেশ করতে হবে।
এরপর ‘অনলাইনে আবেদন করুন’ অপশনে গিয়ে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হবে।
জমিটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে, সেটি প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে। ক্রয়, ওয়ারিশ, হেবা, ডিক্রি, নিলাম কিংবা অন্য কোনো বৈধ সূত্র-প্রযোজ্য তথ্য নির্বাচন করতে হবে।
এরপর বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজার তথ্যের সঙ্গে খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণ দিতে হবে।
আবেদনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংযুক্ত করতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ, ছবি, স্বাক্ষর, সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা, দলিল, উত্তরাধিকার সনদ কিংবা আদালতের রায়ের কপি।
আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া ট্র্যাকিং নম্বরটি সংরক্ষণ করতে হবে। এই নম্বর দিয়েই পরবর্তী সময়ে আবেদনের অবস্থা জানা যাবে।
এরপর কী হবে?
আবেদন জমা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস তা তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রক্রিয়ায় নেয়। প্রয়োজন হলে সরেজমিন তদন্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন ও কাগজপত্র যাচাই শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে নামজারি অনুমোদন দেওয়া হয়।
নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী মহানগর এলাকায় নামজারি নিষ্পত্তির সময় ৪৫ কর্মদিবস এবং অন্যান্য এলাকায় ৩০ কর্মদিবস। ই-নামজারি ব্যবস্থায় সাধারণত ২৮ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থাৎ আবেদন করেই কাজ শেষ নয়। আবেদনের পর সেটি কোন পর্যায়ে আছে, সেটিও নজরে রাখতে হবে।
খরচ কত?
ই-নামজারির সরকারি ফিও নির্ধারিত।
আবেদনের সময় আবেদন ও নোটিশ ফি বাবদ দিতে হয় ৭০ টাকা। আবেদন অনুমোদনের পর খতিয়ান প্রস্তুতের জন্য ডিসিআর ফি ১ হাজার ১০০ টাকা।
সব মিলিয়ে সরকারি নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা।
এই অর্থ অনলাইনে নগদ, বিকাশ, রকেট, উপায়, ভিসা, মাস্টারকার্ড কিংবা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়।
শুনানিও হতে পারে অনলাইনে
নামজারি আবেদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে অনলাইনে শুনানির আবেদন করার সুযোগও রয়েছে।
অর্থাৎ নামজারি এখন শুধু ভূমি অফিসের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে করা একটি কাজ নয়; পুরো প্রক্রিয়ার বড় একটি অংশই অনলাইনে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
খতিয়ানও পাওয়া যাবে অনলাইনে
ডিসিআর ফি পরিশোধের পর আবেদনকারী অনলাইনেই আবেদন ট্র্যাক করতে পারবেন। অনুমোদন সম্পন্ন হলে খতিয়ান ও ডিসিআরের কপি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করা যায়।
ভূমি সংক্রান্ত অন্যান্য সেবা ও তথ্যের জন্য ব্যবহার করা যায়—
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি সেবা পোর্টাল
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, কিউআর কোডযুক্ত অনলাইন ডিসিআর আইনগতভাবে বৈধ এবং ম্যানুয়াল ডিসিআরের সমতুল্য। ফলে শুধু ডিসিআরের জন্য আলাদাভাবে ভূমি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।




