ড. এডিথ ব্রাচো-সানচেজ, সিএনএন।।
আমাদের বড় ছেলে চার বছরে পা দেওয়ার কিছুদিন পরই পাঁচ ও ছয় বছর বয়সী শিশুদের একটি বিশেষ বাস্কেটবল লিগে খেলার সুযোগ পেল। আমরা ভীষণ খুশি হয়েছিলাম।
আমাদের ছোট্ট ছেলেটি বাস্কেটবলে ভালো ছিল। শুধু আমরা নই, অন্যরাও সেটা বুঝতে পেরেছিল। স্থানীয় একটি দলে তিন ও চার বছর বয়সী শিশুদের সঙ্গে সে খেলত এবং প্রায় প্রতিবারই দলের সবার চেয়ে ভালো করত। তাই তাকে আরও চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলা উচিত, এমনটাই মনে হয়েছিল। তার চেয়ে একটু বড়, একই সঙ্গে ভালো খেলে এমন শিশুদের সঙ্গে খেললে তাকে নিশ্চয়ই আরও উন্নতি করতে হবে।
আমার স্বামী একসময় কলেজ পর্যায়ে বাস্কেটবল খেলেছেন। আমি শিশু বিশেষজ্ঞ। দুজন মিলে লিগের ফি দিলাম, প্রতি সপ্তাহের অনুশীলনে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের সময়সূচিও নতুন করে সাজালাম।
এরপর যা ঘটল, পেছন ফিরে দেখলে সেটাই ছিল স্বাভাবিক পরিণতি।
শুরুতে সে দারুণ উৎসাহী ছিল। দলের জার্সি পরলে সেটি প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে আসত। সে দৌড়ে মাঠে নামত, ড্রিবলিং করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত। এমন কিছু শটও সে নিতে পারত, যেগুলো বয়সে বড় শিশুরাও অনেক সময় মিস করত।
কিন্তু অনুশীলনের ধাপগুলো যত জটিল হতে থাকল, তার চার বছরের মস্তিষ্ক ততই পিছিয়ে পড়তে লাগল। আর যখন দৌড় প্রতিযোগিতা হতো, প্রায় প্রতিবারই সবার শেষে পৌঁছাত সে।
কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমরা লক্ষ করলাম, অনুশীলনের দিন সামনে এলেই সে অস্থির হয়ে পড়ছে। একসময় সে সরাসরি যেতে অস্বীকার করল।
‘আর মজা লাগে না,’ সে আমাদের বলল।
আমি আমার শিশু মনোবিজ্ঞান ও মনোরোগবিদ্যার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললাম। তাদের পরামর্শ নিয়ে নানা কৌশলে তাকে মৌসুমটা শেষ করানোর চেষ্টা করলাম। কেন জানি মনে হয়েছিল, যে কাজ শুরু করেছি, সেটি শেষ করাটা খুব জরুরি।
কিন্তু পুরো অভিজ্ঞতা আমাদের একটা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল: আমরা কীভাবে এমন একটা জিনিসের আনন্দটাই নষ্ট করে ফেললাম, যেটা আসলে তার ভালো লাগার কথা ছিল?
খেলাধুলার আনন্দটাই কেড়ে নিচ্ছি আমরা
অন্য পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, আমরা একা নই। অনেক অভিভাবকই ভালো চেয়েই এমন কিছু করছেন, যার ফলে শৈশবের সবচেয়ে উপকারী অভিজ্ঞতাগুলোর একটি শিশুদের জন্য চাপ ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
একসময় শিশুদের খেলাধুলা ছিল অনেক বেশি স্থানীয়, সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত। পাড়ার মাঠ, বিনোদনমূলক লিগ, কমিউনিটি দল আর নিজেদের মধ্যে আয়োজিত খেলাই ছিল মূল বিষয়। বিভিন্ন বয়সের শিশুরা একসঙ্গে খেলত। তারাই নিয়ম বানাত, নিজেরাই দল গড়ত। বড়রা সাধারণত দূরে থাকতেন, কখনো কখনো একেবারেই থাকতেন না।
শিশুদের সংগঠিত খেলাধুলার শুরুর দিকেও এই চিত্র খুব একটা বদলায়নি। ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত লিটল লিগের শুরুটিও ছিল স্থানীয় ও সহজভাবে। পেনসিলভানিয়ার উইলিয়ামসপোর্টে ৩০টি শিশুকে নিয়ে তিনটি দল গড়ে গ্রীষ্মকালীন বেসবল খেলা শুরু হয়েছিল। এর প্রতিষ্ঠাতার লক্ষ্য ছিল খেলাধুলার মাধ্যমে ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা, ন্যায্যতা ও দলগত কাজ শেখানো।
সেই সময় শিশুরাও সাধারণত সারা বছর একটি খেলায় আটকে থাকত না। ঋতু বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে খেলাও বদলাত।
কিন্তু ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে এসে শিশুদের খেলাধুলার সেই স্থানীয়, স্বতঃস্ফূর্ত ও কম চাপের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
ট্রাভেল ও ক্লাব দল বাড়তে থাকল। ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত কোচিং এবং ‘এলিট’ প্রশিক্ষণ এক বড় বাণিজ্যিক শিল্পে পরিণত হলো। একই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল একটি ধারণা: ভবিষ্যতে ভালো করতে চাইলে শিশুকে আট বা নয় বছর বয়সের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট খেলায় বিশেষায়িত করতে হবে এবং সারা বছর সেই খেলাই খেলতে হবে।
বিজ্ঞান এই ধারণাকে সমর্থন করেনি। কিন্তু বাজার করেছে।
ফলে ধীরে ধীরে অভিভাবকদের মধ্যেও বার্তাটি প্রতিষ্ঠিত হলো, শিশুকে যত দ্রুত সম্ভব আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিতে হবে।
বেশিরভাগ শিশুই কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলা করে না
এই প্রবণতার টান আমি নিজেও বুঝি। কারণ নিজের সন্তানকে কোনো কিছুতে ভালো করতে দেখলে তাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে পাঠানোকে চাপ মনে হয় না। বরং মনে হয়, এটাই হয়তো একজন দায়িত্বশীল অভিভাবকের কাজ।
কে-ই বা সেই বাবা-মা হতে চান, যিনি পরে ভাববেন, ‘আমার সন্তানের সম্ভাবনাটা হয়তো আমি নষ্ট করে ফেলেছি’?
এর সঙ্গে কখনো কখনো আরও নীরব একটি প্রত্যাশাও কাজ করে। ট্রাভেল দলের ফি, ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণের খরচ, বাদ দেওয়া জন্মদিনের অনুষ্ঠান কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ের বিনিময়ে হয়তো একদিন একটি কলেজ স্কলারশিপ পাওয়া যাবে। কারও কারও মনে আরও বড় স্বপ্ন থাকে, সন্তান হয়তো একদিন পেশাদার খেলোয়াড় হবে।
কিন্তু পরিসংখ্যান অন্য কথা বলে।
এনসিএএর অংশগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, উচ্চবিদ্যালয়ের ক্রীড়াবিদদের প্রায় ৭ শতাংশ পরবর্তী সময়ে কোনো না কোনো খেলায় কলেজ পর্যায়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। আর ২ শতাংশেরও কম শিক্ষার্থী একাডেমিক স্কলারশিপ পায়। এরপর পেশাদার পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যায়।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের তথ্য অনুযায়ী, খেলাভেদে উচ্চবিদ্যালয়ের ক্রীড়াবিদদের মাত্র ০.২ থেকে ০.৫ শতাংশ শেষ পর্যন্ত পেশাদার খেলোয়াড় হতে পারে।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ অবশ্যই শিশুদের খেলাধুলা থেকে দূরে রাখা নয়। বরং আমাদের নিজেদের কাছে সৎ হওয়ার প্রয়োজন আছে: আমরা আসলে কী অর্জন করতে চাইছি?
আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আমরা কী হারাচ্ছি?
শিশুদের স্থানীয় ও আনন্দনির্ভর খেলাকে যখন আমরা ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারের সিঁড়ি হিসেবে দেখতে শুরু করি, তখন খেলাধুলার আসল উদ্দেশ্যটাই বদলে যায়।
খেলাধুলা শিশুর জন্য কতটা উপকারী
খেলাধুলা শিশুদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। প্রায় ১৯০টি গবেষণার একটি বড় সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার সঙ্গে শিশুদের আত্মমর্যাদাবোধ ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি বাড়ার এবং বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমার একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক রয়েছে।
দলগত খেলাধুলার ক্ষেত্রে এই ইতিবাচক প্রভাব আরও শক্তিশালী বলে দেখা গেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস বলছে, খেলাধুলার এসব উপকার আসে যখন শিশুর অংশগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদি, বৈচিত্র্যময় এবং আনন্দদায়ক হয়। শুধু ফলাফল, জয় বা এলিট পর্যায়ে পৌঁছানোকে লক্ষ্য বানালে সেই উপকার নিশ্চিত হয় না।
বরং অল্প বয়সে একটি খেলায় বিশেষায়িত হয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের সঙ্গে বার্নআউট, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। খেলাধুলা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ে।
আর শিশুরা কেন খেলাধুলা ছেড়ে দেয়, তার সবচেয়ে প্রচলিত উত্তর কী?
‘আর মজা লাগে না।’
আঘাত পাওয়া বা প্রতিভার অভাব নয়, বরং আনন্দ হারিয়ে ফেলাই শিশুদের খেলাধুলা ছেড়ে দেওয়ার সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণগুলোর একটি।
তাহলে কী করা উচিত?
সমাধান খুব কঠিন নয়। বরং কঠিন হলো প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যাওয়া।
নরওয়ের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। শিশুদের একাধিক খেলা খেলতে দিন। তাদের হারতে দিন, যেন প্রতিটি হারকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা মনে না হয়। অনুশীলন যেন এমন কিছু হয়, যার জন্য তারা অপেক্ষা করে, এমন কিছু নয় যার কথা ভাবলেই তাদের ভয় বা অস্বস্তি তৈরি হয়।
আমরা যদি চাই খেলাধুলা শিশুদের জন্য তার পুরোনো ইতিবাচক ভূমিকা পালন করুক, তাহলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াক, মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করুক এবং অন্যদের সঙ্গে একসঙ্গে চলতে শেখাক, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
শিশুদের খেলাধুলাকে কলেজে ভর্তি বা পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।
খেলাধুলাকে আবার খেলাই হতে দিতে হবে।
অর্থাৎ, আনন্দের জায়গা।
শেষ পর্যন্ত আমরা কী শিখলাম
আমাদের ছেলের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত আমরা সেই আনন্দের পথেই ফিরেছিলাম।
‘এলিট’ বাস্কেটবলের মৌসুম শেষ হওয়ার পর সে কিছুদিন বিরতি নিল। নিজের পছন্দে সাঁতার ও ফুটবল খেলল।
এই শরতে সে আবার বাস্কেটবলে ফিরেছে। এবার এমন একটি দলে, যেখানে বয়সের ভিন্নতা আছে এবং তার সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর বয়সী শিশুরাও খেলছে।
এখন সে সেখানে ভালো করলে আমরা কী করব?
তাকে আরও কঠিন, আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ঠেলে দেওয়ার পুরোনো তাগিদকে কি এবার আমরা সামলাতে পারব?
আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, পারব।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের সন্তানের খেলাধুলা থেকে যা পাওয়া উচিত, তা কোনো ট্রফি, র্যাঙ্কিং বা ভবিষ্যতের স্কলারশিপের প্রতিশ্রুতি নয়।
তার পাওয়া উচিত আনন্দ।
আর সেই আনন্দের মধ্য দিয়েই আত্মবিশ্বাস, বন্ধুত্ব, দলবদ্ধতা এবং নিজের ওপর ভরসা তৈরি হওয়ার সুযোগ।
দ্রষ্টব্য: অনুবাদে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া হয়েছে।




