তাসমিয়া তাবাসসুম ।।
শহুরে যান্ত্রিকতা আর কোলাহলে নিত্য-নতুন পণ্যের ভীড়ে ক্ষতিকর ফ্যাশন হিসেবে ভ্যাপিং বা ই-সিগারেট তার জায়গা নিশ্চিত করে নিয়েছে। এই ক্ষতিকর ফ্যাশন তরুন প্রজম্মকে কুক্ষিগত করে ফেলছে। মূলত সিগারেটের বিকল্প হিসেবে ২০০৭ সালে বাজারে আসে এই ই-সিগারেট। এই পণ্যের বাজারজাতকারীদের মত অনুসারে ই-সিগারেট স্বাদে তামাকজাত সিগারেটের মতোই, কিন্তু ক্ষতির মাত্রা কম। এমনকি তা সিগারেটের নেশা কমাতেও নাকি সাহায্য করবে। আসলেই কি তা সম্ভব? আসুন আজকের আয়োজনে ভ্যাপিং বা ই-সিগারেটের আদ্যোপান্ত জেনে নিই।
ভ্যাপিং বা ই-সিগারেটের আদ্যোপান্ত
ভ্যাপিং বা ই-সিগারেট ব্যাটারি চালিত এক টাইপের যন্ত্র। এই সিগারেটের ভেতরে প্রোপাইলিন গ্লাইকল অথবা ভেজিটেবল গ্লিসারিন এবং সুগন্ধী মিশ্রিত থাকে। এছাড়াও এর ভিতরের অংশে নিকোটিনের দ্রবন থাকে, যা থেকে অনেক বেশি ধোয়া তৈরি হয়। এতে মস্তিকে অনেকটা সিগারেটের মতো অনুভূতি হয় এবং এতে নাকি কোনরূপ ক্ষতি হয় না। কিন্তু ই-সিগারেটের বাজারজাতকারীরা যতই এর আকাশকুসুম সুনাম করুক না কেন, সম্প্রতি বেশ কিছু গবেষণার মাধ্যমে এর ক্ষতিকর দিক বেরিয়ে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই সুগন্ধি ই-সিগারেট গ্রহণ করলে হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ নানবিধ জটিল রোগ হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন আমেরিকা এবং ভারতে এই ই-সিগারেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন এর মতে ই-সিগারেটকে বিষ হিসেবে তুলনা করা হয়েছে। তাদের মতে, ই-সিগারেটের রাসায়নিক ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান, ক্ষতিকর ফরমালডিহাইড, ডাইঅ্যাসিটাইল এবং আরও ক্ষতিকর ধাতু রয়েছে। ধোয়ার মাধ্যমে এইসব শরীরে প্রবেশ করে হৃদরোগের ঝুঁকি এবং ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। এছড়াও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানিয়েছেন, এই ধরনের ধোঁয়া গ্রহণ শরীরের ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে।
যেভাবে ই-সিগারেট কাজ করে
এই সিগারেটে আগুনের ব্যবহার নেই। রাসায়নিক তরলের সাথে মেশানো নিকোটিন লিথিয়াম ব্যাটারির শক্তির ফলে পুড়ে ধোয়া হয় এবং তা মুখে প্রবেশ করে। এতে সিগারেটের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ধোয়া উৎপন্ন হয়। মূলত নিকোটিন, প্রোপাইলিন গ্লাইকল এবং সুগন্ধী এই সিগারেটে মিশ্রিত থাকে। ভাপিংয়ে তামাকজাত সিগারেটের মতোই নিকোটিন আছে। যার ফলে তা মস্তিষ্কের মধ্যে স্নায়ুতে উদ্দীপকের কাজ করে থাকে। তাই, স্বাদে বর্ণে বৈচিত্র্যতার দরুন ই-সিগারেটের আসক্তিও দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রথমে ফ্যাশন হিসেবে নিলেও পরবর্তীতে তা থেকে বের হওয়া কষ্টসাধ্য, ফলে দিন দিন এর আসক্তির সংখ্যা বেঁড়েই চলছে। মূলত টিনেজাররাই এর বেশি শিকার হচ্ছে।
ই-সিগারেটের সাথে তামাকজাত সিগারেটের পার্থক্য কী?
একটি তামাকজাত সিগারেট পুড়ে প্রায় সাত হাজারের মতো কেমিকেল ধূমপায়ীর শরীরে প্রবেশ করে। আর এর ফলে ক্যান্সারসহ মারাত্মক রোগের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে ই-সিগারেটের লিকুইডের মূল উপাদান পিজি এবং ভিজি। এই পিজি এবং ভিজি উপাদানের সঙ্গে নিকোটিন মিশ্রিত করে তৈরি হয় ভ্যাপিংয়ের লিকুইড। লিকুইড তৈরির মূল উপাদান হিসেবে এফডিএ অনুমোদিত ফুডগ্রেডেড পিজি ও ভিজি ব্যবহার করা হয়। যা ফলে ভেপিংয়ের সময় একপ্রকার বাষ্প বা ধোয়া দেখা যায়।
মূলত ই-সিগারেটের মূল উপাদান নিকোটিন, যা অনেক দ্রুত আসক্তি সৃষ্টি করে। ফলে অনেকেই তামাকজাত সিগারেট ছাড়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু এতে মুক্তি নয় বরং আরও নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, ই-সিগারেটকে সুনিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিগারেটের বিকল্প হিসেবে ভাপিং বা ই-সিগারেট
ধূমপানের বিকল্প হিসেবে ই-সিগারেট হতে পারে না। এটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আমাদের দেশে কিছু কিশোর-তরুন নিজেকে স্মার্ট এবং আধুনিক দেখাতে ঝুঁকে পড়ছে ই-সিগারেটের নেশায়। ফ্ল্যাশ লাইট, লেজার লাইট কিংবা ছোটখাটো ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেটের স্মার্ট গ্যাজেট এই ই-সিগারেট। স্বাদে বর্ণে ভিন্নতর, অনেক বেশি ধোয়ার আধিক্য এই সহজলভ্য ই-সিগারেট ক্রমেই তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আজকাল এই সিগারেট শহর কিংবা গ্রাম সব জায়গায়ই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কিশোর, তরুণদের হাতে খুব সহজেই তা দেখা যাচ্ছে এবং ফলে এর আসক্তির সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। আর তাতে মনোযোগ নষ্ট, মস্তিষ্কেরও ক্ষতি এমনকি বিভিন্ন রোগের উদ্ভব হচ্ছে। যা কিশোর-তরুনদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকটা যেমন ক্ষতি করছে এবং মানসিক ভাবেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
আধুনিকতার নামে কোন পণ্য যখন আমাদের সামনে আসে আমরা নতুন ফ্যশন ভেবে, তা খুব সহজেই গ্রহণ করি নেই। কিন্তু ভালভাবে তা যাচাই-বাছাই করি না। ঠিক তেমনি ঘটেছে ভ্যাপিং বা ই-সিগারেটের বেলায়। ধুমপানের বিকল্প আর আধুনিকতাকে পুঁজি করে, এক ধরনের লাভজনক মুনাফা অর্জনে এর বাজারজাতকারীরা আমাদের সামনে তা চমকপ্রদ হিসেবে তুলে ধরছে। আর আমরাও খুব সহজেই তা গ্রহণ করে নিচ্ছি। মূলত তা আমাদের জন্য ক্ষতি বৈ আর কিছুই হচ্ছে না। তাই ভ্যাপিং বা ই-সিগারেটের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেনে আমার তা গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।




