জালিয়াতি ও আইনের ফাঁক ব্যবহার করে দালালরা বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য এবং ভারতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে একটি রমরমা ব্যবসায় পরিণত করেছে।
জ্যোতি ঠাকুর, আমিনুল ইসলাম মিঠু এবং হানান জাফর
আল জাজিরা ।। প্রকাশিত: ৪ জুলাই ২০২৫
জয়পুরহাট/ঢাকা, বাংলাদেশ, এবং নয়াদিল্লি/কলকাতা, ভারত: বিকেলের হালকা রোদে, ৪৫ বছর বয়সী সফিউদ্দিন বাংলাদেশের কালাই উপজেলার বাইগুনি গ্রামে তার অসম্পূর্ণ ইটের দেয়ালের বাড়ির বাইরে বসে আছেন, তার কোমরের এক পাশে হালকা ব্যথা।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে, তিনি ভারতে তার কিডনি বিক্রি করেছিলেন ৩.৫ লক্ষ টাকায় ($২,৯০০), এই আশায় যে তার পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেবেন এবং তার তিন সন্তান – পাঁচ ও সাত বছর বয়সী দুই মেয়ে এবং ১০ বছর বয়সী বড় ছেলের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করবেন। সেই টাকা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, বাড়িটিও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে কিন্তু তার শরীরের ব্যথা তাকে প্রতিনিয়ত এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। এখন তিনি একটি কোল্ড স্টোরেজ প্রতিষ্ঠানে দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন, কিন্তু তার স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে – প্রতিনিয়ত ব্যথা এবং ক্লান্তি তাকে এমনকি সাধারণ কাজগুলোও করতে কষ্ট দিচ্ছে।
“আমি আমার পরিবারের একটি ভালো জীবনের জন্য আমার কিডনি দিয়েছি। আমি আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য সবকিছু করেছি,” তিনি বলেন।
তখন তার কাছে এটি একটি বিপজ্জনক বলে মনে হয়নি। দালালরা তাকে যেভাবে বুঝিয়েছিল, তা একটি ঝুঁকি না হয়ে একটি সুযোগ বলেই মনে হয়েছিল। তিনি প্রাথমিকভাবে সন্দেহপ্রবণ ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশা তার সন্দেহ দূর করে দেয়।
দালালরা তাকে একটি মেডিকেল ভিসায় ভারতে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে সমস্ত ব্যবস্থা – ফ্লাইট, কাগজপত্র এবং হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা – তারাই সম্পূর্ণভাবে ব্যবস্থা করেছিল। ভারতে পৌঁছানোর পর তিনি বাংলাদেশি হলেও সকল পরিচয় জাল করা হয়েছিল। তার কিডনির সম্ভাব্য প্রাপকের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক দেখাতে এই সকল নথিপত্র জাল করা হয়েছিল। তার পরিচয় পরিবর্তন করা হয়েছিল, এবং তার কিডনি একজন অপরিচিত প্রাপকের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল যাকে তিনি কখনো দেখেননি।
“আমি জানি না কে আমার কিডনি পেয়েছে। তারা [দালালরা] আমাকে কিছুই জানায়নি,” সফিউদ্দিন বলেন। আইন অনুযায়ী, ভারতে অঙ্গদান শুধুমাত্র নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বা সরকারের বিশেষ অনুমতি নিয়ে অনুমোদিত, কিন্তু পাচারকারীরা সবকিছু – পারিবারিক সম্পর্ক, হাসপাতালের রেকর্ড, এমনকি ডিএনএ পরীক্ষাও – আইন ফাঁকি দেওয়ার জন্য জালিয়াতি করে থাকে।
“সাধারণত, বিক্রেতার নাম পরিবর্তন করা হয়, এবং একটি নোটারি সার্টিফিকেট – যা একজন আইনজীবী দ্বারা সত্যায়িত করা, কিডনি প্রাপকের সাথে একটি পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য তৈরি করা হয়। জাল জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে এটা প্রমাণ করা হয়। যা দেখে মনে হয় দাতা একজন আত্মীয়, যেমন বোন, মেয়ে, বা অন্য পরিবারের সদস্য, সহানুভূতি থেকে একটি অঙ্গ দান করছেন,” বলেন মনির মনিরুজ্জামান, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অঙ্গ প্রতিস্থাপন টাস্ক ফোর্সের সদস্য, যিনি দক্ষিণ এশিয়ায় অঙ্গ পাচার নিয়ে গবেষণা করছেন।
সফিউদ্দিনের গল্পটি আলাদা নয়। জয়পুরহাটের বাইগুনি গ্রামে কিডনি দান এত সাধারণ বিষয় যে স্থানীয়রা ৬,০০০ জনের কম মানুষের এই গ্রামটিকে “এক কিডনির গ্রাম” হিসেবে চেনে। বাইগুনি যে কালাই উপজেলার অন্তর্গত, সেটি কিডনি বাণিজ্য শিল্পের মুল কেন্দ্র: ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল গ্লোবাল হেলথ প্রকাশনায় প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে যে এই অঞ্চলের প্রতি ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন কিডনি বিক্রি করেছেন।
অধিকাংশই ৩০ এর কোটায় থাকা পুরুষ, যারা নগদ অর্থের লোভে এই পথে পা রাখেন। ৮৩ শতাংশ বিক্রেতা দারিদ্র্যকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, অন্যরা দেনা পরিশোধ, মাদকাসক্তি অথবা জুয়া খেলাকে দায়ী করেছেন।
সফিউদ্দিন বলেন যে দালালরা – যারা তার পাসপোর্ট নিয়ে গিয়েছিল – সেটি আর ফেরত দেয়নি। এমনকি অস্ত্রোপচারের পর তাকে যে ওষুধগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও তিনি পাননি। “তারা [দালালরা] সবকিছু নিয়ে গেছে।”
দালালরা প্রায়শই অস্ত্রোপচারের পর পাসপোর্ট এবং মেডিকেল প্রেসক্রিপশন নিয়ে নেয়, যাতে কিডনি প্রতিস্থাপনের কোনো চিহ্ন না থাকে এবং এতে কিডনি দাতারা চিকিৎসা সুবিধাও পান না।
কিডনিগুলো বাংলাদেশ বা ভারতের ধনী রোগীদের কাছে বিক্রি করা হয়, যাদের অনেকেই দীর্ঘ অপেক্ষা যাতে না করতে হয় এবং আইনি প্রতিস্থাপনের কঠোর নিয়মকানুন ফাঁকি দিতে চান। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ২০২৩ সালে প্রায় ১৩,৬০০টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল – যেখানে প্রতি বছর আনুমানিক ২,০০,০০০ রোগী শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগে আক্রান্ত হন।
আল জাজিরা বাংলাদেশের এক ডজনেরও বেশি কিডনি দাতার সাথে কথা বলেছে, যাদের সকলেই আর্থিক কষ্টের কারণে কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার একই ধরনের গল্প বলেছেন। এই বাণিজ্যটি একটি সহজ কিন্তু নির্মম সমীকরণের দ্বারা পরিচালিত হয়: যেখানে দারিদ্র্য এই পথের সরবরাহ তৈরি করে, যখন আবার প্রতিস্থাপনে দীর্ঘ অপেক্ষা, আইনগতভাবে সিদ্ধ দাতাদের অভাব, দ্রুত প্রতিস্থাপনের জন্য ধনী রোগীদের অর্থ খরচ করতে চাওয়া এবং সর্বোপরি একটি দুর্বল ব্যবস্থা মিলে এটি একটি শেষ না হওয়ার চক্র তৈরি করেছে।
হতাশার মূল্য
৪৫ বছর বয়সী জোসনা বেগম, কালাই উপজেলার বিনাই গ্রামের একজন বিধবা, ২০১২ সালে তার স্বামীর মৃত্যুর পর তার ১৮ এবং ২০ বছর বয়সী দুই মেয়েকে বড় করতে সংগ্রাম করছিলেন। তিনি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করার জন্য ঢাকায় চলে যান, যেখানে তিনি আরেকজন পুরুষ বেলালকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর, বেলাল এবং জোসনা উভয়কেই ২০১৯ সালে ভারতে তাদের কিডনি বিক্রি করার জন্য একজন দালাল প্রলুব্ধ করেছিল।
“এটা একটা ভুল ছিল,” জোসনা বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে দালালরা প্রথমে তাকে পাঁচ লাখ টাকা (প্রায় $৪,১০০) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারপর তাকে রাজি করানোর জন্য প্রস্তাব বাড়িয়ে সাত লাখ (প্রায় $৫,৭০০) করে। “কিন্তু অপারেশনের পর, আমি মাত্র তিন লাখ [$২,৫০০] পেয়েছি।”
জোসনা বলেন যে তাকে এবং বেলালকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিয়াক সায়েন্সেস-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে তাদের অস্ত্রোপচার করা হয়। “আমাদের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাসে করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে হাসপাতালের কাছে একটি ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে আমাদের রাখা হয়েছিল।”
প্রতিস্থাপন করার জন্য, দালালরা কাগজপত্র জাল করেছিল এভাবে যে, তিনি এবং প্রাপক রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়। সফিউদ্দিনের মতো, তিনিও জানেন না কে তার কিডনি পেয়েছে।
বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিয়াক সায়েন্সেসের কর্মকর্তারা এই ঘটনায় বক্তব্য দেওয়ার জন্য আল জাজিরার অনুরোধে সাড়া দেয়নি। কলকাতা পুলিশ এর আগে ২০১৭ সালে একই হাসপাতালে অন্যান্য দালালদের বিরুদ্ধে অবৈধ কিডনি প্রতিস্থাপনে সহায়তা করার অভিযোগ এনেছিল।
জোসনা বলেন যে তার পাসপোর্ট এবং পরিচয়পত্র সম্পূর্ণরূপে দালালদের হাতে ছিল। “প্রেসক্রিপশনগুলো নিয়ে যাওয়ায় আমার কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমি আমার পাসপোর্ট চেয়েছিলাম। তারা সেটি আর ফেরত দেয়নি,” তিনি বলেন।
তিনি প্রায় দুই মাস ভারতে ছিলেন এবং তারপর বাংলাদেশে ফিরে আসেন – দালালদের সাথে, যারা তার পাসপোর্ট রেখেছিল এবং তখনও তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া অর্থ পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
দালালরা তার পরিবারের জন্য সহায়তা এবং এমনকি তার সন্তানদের জন্য চাকরিরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু প্রাথমিক অর্থপ্রদান এবং ঈদে কিছু সামান্য অর্থপ্রদানের পর, তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
তাকে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অর্থ প্রদানের পরে – সেটিও তিন লাখ টাকা ($২,৫০০) – বেলাল জোসনাকে ছেড়ে চলে যায়, পরে অন্য একজন মহিলাকে বিয়ে করে। “আমার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে,” জোসনা বলেন।
জোসনা এখন প্রতিনিয়ত ব্যথা ভোগেন এবং ওষুধ কেনার জন্য কষ্ট করেন। “আমি কোনো ভারী কাজ করতে পারি না,” তিনি বলেন। “আমাকে বাঁচতে হবে, কিন্তু আমার সব সময় ওষুধের প্রয়োজন।”
‘চক্রের বন্দুকের সামনে’
কিছু ক্ষেত্রে, ভুক্তভোগীরাও কিডনি কেলেঙ্কারির অপরাধী হয়ে উঠেছে।
মোহাম্মদ সজল (নাম পরিবর্তিত), একসময় ঢাকার একজন ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি ইভ্যালি নামে একটি জমকালো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রেসার কুকার, প্লাস্টিকের পাত্র এবং ব্লেন্ডারের মতো গৃহস্থালীর জিনিস বিক্রি করতেন, যা বড় লাভের প্রতিশ্রুতি দিত। কিন্তু ২০২১ সালে কেলেঙ্কারির পর যখন ইভ্যালি ধসে পড়ে, তখন তার সঞ্চয় – এবং তার জীবিকার পথ নষ্ট হয়ে যায়।
ঋণে ডুবে এবং তার পাওনা পরিশোধের প্রচণ্ড চাপে, তিনি ২০২২ সালে দিল্লির ভেঙ্কটেশ্বর হাসপাতালে তার কিডনি বিক্রি করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত ১০ লাখ টাকা ($৮,২০০) যা কখনোই বাস্তবে আসেনি। তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ৩.৫ লাখ টাকা ($২,৯০০)।
“তারা [দালালরা] আমাকে ঠকিয়েছে,” সজল বলেন। ভেঙ্কটেশ্বর হাসপাতালও এই ঘটনায় মন্তব্য করার বারবার অনুরোধে আল জাজিরার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
সে সময় সজল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে তার কিডনির জন্য তিনি যা পাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তা উপার্জনের একটাই উপায় ছিল: অন্যদের ঠকানোর জন্য দালালদের সাথে যোগ দেওয়া।
কয়েক মাস ধরে, তিনি একজন দালাল হিসেবে কাজ করেন, ভারতীয় হাসপাতালে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি দাতার জন্য কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তার মূল চক্রদের সাথে আর্থিক ঝামেলার পর, তিনি নিজের জীবনের ভয়ে এই ব্যবসা ছেড়ে দেন। “আমি এখন এই গ্যাংয়ের বন্দুকের সামনে আছি,” তিনি বলেন। তিনি বলেন, তিনি যে নেটওয়ার্কটি ছেড়ে গেছেন, সেটি বাংলাদেশের হাসপাতাল থেকে শুরু করে ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যন্ত অবাধে কাজ করে। “ডাক্তার থেকে শুরু করে প্রাপক এবং সীমান্তের উভয় পাশের দালালরা সবাই জড়িত,” তিনি বলেন।
এখন, সজল ঢাকায় একজন রাইড-শেয়ার চালক হিসেবে কাজ করেন, অতীত থেকে পালাতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষত রয়ে গেছে। “কেউ শখ করে বা ইচ্ছামতো কিডনি দেয় না,” তিনি বলেন। “এটা একটা সহজ হিসাব: হতাশা এর দিকে নিয়ে যায়।”
সীমান্ত পারাপার কিডনি পাচার বাণিজ্য স্বীকার করে, বাংলাদেশ পুলিশ বলছে যে তারা জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক এনামুল হক সাগর বলেন যে, ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তাদের পাশাপাশি, অঙ্গ পাচার নেটওয়ার্ক ট্র্যাক করতে এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে আন্ডারকাভার তদন্তকারীদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
“এই বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে, এবং আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি,” তিনি বলেন।
সাগর বলেন যে, পুলিশ অঙ্গ পাচার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত একাধিক ব্যক্তিকে, যার মধ্যে দালালও রয়েছে, গ্রেপ্তার করেছে। “এই নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে অনেক লোক কিডনি বিক্রিতে জড়িত হয়ে পড়ে, এবং আমরা তাদের ধরার জন্য কাজ করছি,” তিনি যোগ করেন।
সীমান্তের ওপারে, ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও কিডনি পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু চিকিৎসা পেশাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, দিল্লি পুলিশ ৫০ বছর বয়সী কিডনি প্রতিস্থাপন সার্জন ডঃ বিজয়া রাজাকুমারী’কে গ্রেপ্তার করে, যিনি দিল্লির একটি হাসপাতালের সাথে যুক্ত ছিলেন। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেন, তদন্তে দেখা গেছে যে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে, ডঃ রাজাকুমারী একটি বেসরকারি হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের উপর প্রায় ১৫টি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করেছিলেন।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এই গ্রেপ্তারগুলো এতটাই বিক্ষিপ্ত যে কিডনি বাণিজ্যের মূল ব্যবসা মডেলে গুরুতর আঘাত হানতে পারবে না।
এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে পরস্পরমুখী চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে – একদিকে আইন বজায় রাখা, অন্যদিকে চিকিৎসা পর্যটনকেও প্রচার করা, যা ২০২৪ সালে $৭.৬ বিলিয়ন মূল্যের একটি খাত ছিল। এখানে “নৈতিক মান প্রয়োগের পরিবর্তে, শিল্পের অর্থনৈতিক সুবিধার উপর মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা অবৈধ প্রতিস্থাপন চালিয়ে যেতে দেয়,” মনিরুজ্জামান বলেন।
‘বেশি প্রতিস্থাপন মানে বেশি রাজস্ব’
ভারতে, ১৯৯৪ সালের মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন (THOA) অঙ্গ দান নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রাথমিকভাবে পিতামাতা, ভাইবোন, সন্তান এবং স্বামী/স্ত্রীর মতো নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপনের অনুমতি দেয় অঙ্গ বাণিজ্য রোধ করার জন্য। যখন দাতা নিকটাত্মীয় নন, তখন এই ক্ষেত্রে একটি সরকারি নিযুক্ত সংস্থা, যা অনুমোদন কমিটি নামে পরিচিত, এর অনুমোদন নিতে হয় যাতে দানটি পরোপকার করার উদ্দেশ্যে হয় এবং আর্থিক লোভে না হয়।
তবে, কিডনি পাচারে জড়িত দালালরা দাতা এবং প্রাপকদের মধ্যে কাল্পনিক পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য কাগজপত্র জাল করে এই নিয়মকানুনগুলোকে এড়িয়ে যায়। এই জালিয়াতিপূর্ণ নথিগুলো তখন অনুমোদন কমিটিগুলোর কাছে জমা দেওয়া হয়, যা – বিশেষজ্ঞরা বলছেন – প্রায়শই প্রতিস্থাপনগুলো অনুমোদন করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এই অবৈধ পদ্ধতির ভিত্তি হল দালালদের দ্বারা আইনি ফাঁকগুলো সহজে ব্যবহার করা। “তারা জাতীয় আইডি এবং নোটারি সার্টিফিকেট জাল করে দাতা এবং প্রাপকদের মধ্যে কাল্পনিক পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি করে। এই কাগজপত্রগুলো দ্রুত এবং সস্তায় তৈরি করা যায়,” মনিরুজ্জামান বলেন।
এই মিথ্যা পরিচয়গুলো দিয়ে, প্রতিস্থাপনগুলো আত্মীয়দের মধ্যে আইনি দানের ছদ্মবেশে সম্পাদিত হয়। ঢাকায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার) শাহ মুহাম্মদ তানভীর মনসুর বলেন যে, দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের নথি জালিয়াতিতে কোনো ভূমিকা ছিল না, এবং তারা সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া “যথারীতি অনুসরণ” করেছিলেন। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত কিডনি পাচার দমনে তথ্য আদান-প্রদানের কথাও অস্বীকার করেন।
ভারতে, দিল্লির পুলিশের ডেপুটি কমিশনার অমিত গোয়েল, যিনি শহরে কিডনি পাচারের বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত করেছেন, যার মধ্যে ডাক্তার রাজাকুমারীর মামলাও রয়েছে, তিনি বলেন যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায়শই জালিয়াতিপূর্ণ নথি সনাক্ত করতে হিমশিম খায়, যা অবৈধ প্রতিস্থাপনগুলোকে চলতে দেয়।
“আমার তদন্ত করা মামলাগুলোতে, আমি দেখেছি যে অনুমোদন বোর্ড সেই মামলাগুলো অনুমোদন করেছে কারণ তারা জাল নথিগুলো সনাক্ত করতে পারেনি,” তিনি বলেন।
তবে মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেছেন যে ভারতীয় হাসপাতালগুলোরও কাগজপত্রে অসঙ্গতি উপেক্ষা করার জন্য একটি আর্থিক কারন রয়েছে।
“হাসপাতালগুলো চোখ বন্ধ করে রাখে কারণ অঙ্গদান [সাধারণত] বৈধ,” মনিরুজ্জামান বলেন। “বেশি প্রতিস্থাপন মানে বেশি আয়। এমনকি যখন জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পায়, তখন হাসপাতালগুলো দায়িত্ব অস্বীকার করে, জোর দিয়ে বলে যে ডকুমেন্টেশন বৈধ বলে মনে হয়েছিল। এই প্যাটার্ন বাণিজ্যটি চলতে দেয়,” তিনি যোগ করেন।
বাংলাদেশের একাধিক জেলায় কাজ করা একজন দালাল মিজানুর রহমান বলেন যে পাচারকারীরা প্রায়শই ব্যক্তিগত ডাক্তার বা হাসপাতাল পর্যালোচনা কমিটির সদস্যদের লক্ষ্য করে, এই প্রতিস্থাপনগুলোতে সহায়তা করার জন্য ঘুষের প্রস্তাব দেয়। “সাধারণত, বাংলাদেশের দালালরা ভারতে তাদের সহযোগীদের সাথে যোগাযোগ রাখে যারা তাদের জন্য এই ডাক্তারদের ব্যবস্থা করে,” রহমান আল জাজিরাকে বলেন। “এই ডাক্তাররা প্রায়শই অর্থের একটি বড় অংশ নেয়।”
জাতীয় অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন সংস্থার (NOTTO) পরিচালক ডঃ অনিল কুমার – ভারতের অঙ্গ দান এবং প্রতিস্থাপন সমন্বয়কারী কেন্দ্রীয় সংস্থা – অঙ্গ পাচারের ক্রমবর্ধমান ঘটনাগুলোকে সক্ষম করে এমন পদ্ধতিগত অসঙ্গতিগুলোর অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে, NOTTO-এর একজন প্রাক্তন শীর্ষ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে হাসপাতালগুলো প্রায়শই কেবল দালাল এবং আপাতদৃষ্টিতে ইচ্ছুক দাতাদের সাথে নয়, যাদের কাছে বৈধ নথি বলে মনে হয়, ধনী প্রাপকদের বিরুদ্ধেও থাকে। “যদি হাসপাতাল বোর্ড নিশ্চিত না হয়, তবে প্রাপকরা প্রায়শই বিষয়টি উচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে যায় বা আদালতে সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে। তাই তারা [হাসপাতালগুলো] আইনি ঝামেলা এড়াতে এবং প্রতিস্থাপন চালিয়ে যেতে চায়,” এই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন।
এদিকে, অঙ্গ পাচার নেটওয়ার্কগুলো তাদের কৌশল পরিবর্তন করে চলেছে। যখন একটি নির্দিষ্ট স্থানে পুলিশ বা সরকারি নজরদারি বাড়ে, তখন ব্যবসাটি কেবল অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হয়। “একটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল নেই; স্থানগুলো পরিবর্তন হতে থাকে,” মনিরুজ্জামান বলেন। “যখন পুলিশ অভিযান চালায়, তখন হাসপাতাল প্রতিস্থাপন করা বন্ধ করে দেয়।
“দালাল এবং তাদের নেটওয়ার্ক – বাংলাদেশি এবং ভারতীয় দালালরা একসাথে কাজ করে – বিভিন্ন সময়ে নতুন হাসপাতাল নির্বাচন করার জন্য সমন্বয় করে।”
অরক্ষিত সীমান্ত এবং তার ফলাফল
দালাল এবং জড়িত হাসপাতালগুলোর জন্য, এখানে বড় অর্থ জড়িত। প্রাপকরা প্রায়শই একটি কিডনির জন্য $২২,০০০ থেকে $২৬,০০০ পর্যন্ত অর্থ প্রদান করে।
কিন্তু দাতারা এই অর্থের একটি ক্ষুদ্র অংশই পান। “দাতারা সাধারণত তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা [$২,৫০০ থেকে $৪,০০০] পান,” দালাল মিজানুর রহমান বলেন। “বাকি অর্থ দালাল, যারা নথি জাল করে এমন কর্মকর্তা, এবং ডাক্তারদের মধ্যে ভাগ করা হয় যদি তারা জড়িত থাকে। দাতারা ভারতে থাকার সময়ও কিছু অর্থ তাদের উপর খরচ করা হয়।”
কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণার মাত্রা আরও গভীর: পাচারকারীরা বাংলাদেশিদের ভারতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায়, পরে তাদের জোর করে কিডনি দান করানো হয়।
ভুক্তভোগীরা, যারা কাজের জন্য মরিয়া, তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় মিথ্যা কথা বলে, এবং সেখানে এমন অস্ত্রোপচার করা হয় যার পরিণতি তারা বুঝে উঠতে পারেন না। উদাহরণস্বরূপ, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের এক পাচার নেটওয়ার্ক বহু বাংলাদেশি চাকরি প্রার্থীদের বন্দি করে রাখে, তাদের জোর করে অথবা ধোঁকায় ফেলে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করায় এবং পরে খুব সামান্য অর্থ দিয়ে ছেড়ে দেয়। গত বছর, বাংলাদেশ পুলিশ ঢাকায় তিনজন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে, যারা অন্তত ১০ জনকে নয়াদিল্লিতে পাচার করেছিল চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে, পরে তাদের কিডনি প্রতিস্থাপন করানো হয়।
“কিছু মানুষ চরম দারিদ্র্যের কারণে জেনেশুনেই কিডনি বিক্রি করে, কিন্তু বড় একটি অংশ প্রতারণার শিকার,” বলেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান – ব্র্যাক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। “ভারতে এক ধনী রোগীর কিডনি দরকার, একজন মধ্যস্থতাকারী একজন গরিব বাংলাদেশি দাতা খুঁজে বের করে অথবা চাকরির প্রলোভনে কাউকে নিয়ে যায়, এবং এই চক্র চলতেই থাকে।”
ভারতের কিডনি রোগীদের সহায়তা প্রদানকারী সংগঠন ‘কিডনি ওয়ারিয়রস ফাউন্ডেশন’-এর সিইও বসুন্ধরা রাঘবন বলেন, আইনি দাতার ঘাটতি হচ্ছে একটি “বড় চ্যালেঞ্জ” যা পাচারকৃত অঙ্গের চাহিদা বাড়াচ্ছে।
“হতাশ রোগীরা অবৈধ পথে যায়, যা এমন একটি ব্যবস্থাকে পুষ্টি জোগায় যা গরিবদের শিকার করে।”
তিনি স্বীকার করেন, ভারতের আইনি কাঠামো অঙ্গ প্রতিস্থাপনকে এক শোষণমূলক শিল্পে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে, তিনি বলেন, আইন কেবল অঙ্গ বাণিজ্যকে আন্ডারগ্রাউন্ডে ঠেলে দিয়েছে।
“যদি অঙ্গ বাণিজ্য সম্পূর্ণ নির্মূল করা না যায়, তাহলে একটি আরও সংগঠিত এবং নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতির কথা বিবেচনা করা উচিত,” বলেন রাঘবন। “এর মধ্যে থাকতে পারে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসা সহায়তা এবং দাতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য আর্থিক নিশ্চয়তা।”
‘তারা আমার কিডনি নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে’
ফিরে আসি কালাই উপজেলায়, সফিরউদ্দিন বর্তমানে বেশিরভাগ সময়ই বাড়িতে কাটান, তাঁর চলাফেরা ধীর, শক্তি স্পষ্টভাবে কমে গেছে।
“আমি ঠিকমতো কাজ করতে পারি না,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, এমন অনেক রাত আছে যেসব রাতে তিনি জেগে থাকেন, ভাবেন সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে – দালালরা যা দিয়েছিল, আর তারা যা ভেঙে দিয়েছে।
তিনি জানেন না কখন, বা আদৌ পারবেন কিনা, তাঁর বাড়ি সম্পূর্ণ করতে। তিনি ভেবেছিলেন সার্জারি তাঁর পরিবারকে অনেক টাকা এনে দেবে যাতে তারা ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।
বরং, তাঁর সন্তানরা এখন একজন অসুস্থ বাবাকে পেয়েছে – আর তিনি পেয়েছেন এক বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র অনুভব, যা সফিরউদ্দিন আজও ভুলতে পারেননি।
“তারা আমার কিডনি নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে,” বলেন তিনি।
দ্রষ্টব্য: এআই অনুবাদ




