সাজ্জাদ হোসাইন শাহীন ||
বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক আদি ও গভীর। রান্নাঘরে হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে কৃষকের মাঠের হাল, এমনকি বিয়েবাড়ির আয়োজন- সবকিছুতেই বাঁশ ছিল অপরিহার্য। আর সেই বাঁশ দিয়েই গড়ে উঠত নানা শিল্পকর্ম ও ব্যবহারিক সামগ্রী। এর মধ্যে একসময় প্রতিটি ঘরের অপরিহার্য উপকরণ ছিল ‘খালই’।
খালই মানে বড়সড় ঝুড়ির মতো এক পাত্র, তবে শুধু ঝুড়ি নয়- এটি ছিল একধরনের বহুমুখী সহায়ক। ধান, চাল, ডাল, মরিচ কিংবা ভুট্টা সংরক্ষণে যেমন ব্যবহার হতো, তেমনি বাজারের সদাই বা সামাজিক অনুষ্ঠানের খাবার বহনেও এর জুড়ি ছিল না। বিশেষ করে বিয়েবাড়িতে চাল-ডাল থেকে শুরু করে মিষ্টি কিংবা উপহার বহনে খালই যেন ছিল অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
খালই বানানো ছিল এক ধরনের শিল্প। কাঁচা বাঁশ কেটে ফালি করা, সেগুলো শুকিয়ে আবার নকশা করে বুনন- এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল সময়সাপেক্ষ। গ্রামের কারিগররা ধৈর্য ধরে তৈরি করতেন একটি খালই। সোজা-আঁকাবাঁকা বুননের সমন্বয়ে শক্তপোক্ত ও টেকসই এই পাত্র দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যেত।
আজ আর গ্রামীণ হাটে খালইয়ের সারি দেখা যায় না। বাঁশঝাড় কমে যাওয়া, খালই বানানোর কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহহীনতাও এর বিলুপ্তির বড় কারণ।
খালই শুধু একটি ব্যবহারিক জিনিস নয়- এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ, আমাদের শিকড়ের গল্প। আধুনিক জীবনযাপনের ভিড়ে এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে আমরা হারাব নিজেদের ইতিহাসেরও একটি অধ্যায়। তাই প্রয়োজন নতুন উদ্যোগ। হস্তশিল্পকে উৎসাহ দেওয়া, কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং শহুরে জীবনে বাঁশের পণ্যের প্রচলন বাড়ানো গেলে হয়তো আবার খালই ফিরে পেতে পারে তার পুরনো মর্যাদা।
বাংলার গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে খালই কেবল একটি পাত্র নয়, বরং এটি একখণ্ড স্মৃতি। যা বলে দেয় কেমন ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন, কেমন ছিল তাদের সরলতা আর স্বনির্ভরতা।




