Skip to content
November 8, 2026
যানজটে আটকে থাকা জীবন: সময়ের মূল্য কে দেবে?
বহমান সময়

যানজটে আটকে থাকা জীবন: সময়ের মূল্য কে দেবে?

In This Article

    সাপ্তাহিক জনজীবন

    সকাল হয়েছে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে। অফিসে হাজিরা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে, শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হওয়ার সময়ও প্রায় হয়ে এসেছে। অথচ বাসটি একই সড়কের একটি জায়গায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সারি সারি গাড়ি, পেছনেও যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। কেউ ঘড়ি দেখছেন, কেউ বারবার ফোনে অফিসে দেরি হওয়ার খবর দিচ্ছেন, কেউ আবার বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর বহু মানুষের কাছে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা নয়। প্রতিদিনের যাতায়াত যেন এক অনিশ্চিত পরীক্ষার নাম।

    একসময় যানজটকে শহরের ব্যস্ততার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ বলে ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু যখন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যখন কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্য মানুষকে প্রয়োজনের অনেক আগে ঘর ছাড়তে হয়, যখন শিক্ষার্থীকে ক্লাসের চেয়ে রাস্তায় বেশি সময় কাটাতে হয়, তখন যানজট আর নিছক সড়কের সমস্যা থাকে না। এটি মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, মানসিক স্বস্তি ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি বড় সংকটে পরিণত হয়।

    প্রশ্ন হলো, প্রতিদিন যে বিপুল সময় সড়কে হারিয়ে যাচ্ছে, তার মূল্য কে দেবে? যে শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যে অতিরিক্ত অর্থ যাতায়াতে ব্যয় হচ্ছে, যে শিক্ষার্থী ক্লান্ত হয়ে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাচ্ছে, যে রোগী সময়মতো হাসপাতালে যেতে পারছেন না, তাঁদের ক্ষতির হিসাব কে রাখছে?

    যানজটের মূল্য শুধু রাস্তায় আটকে থাকা নয়

    ঢাকার যানজটের অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা হয়েছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত Cost of Traffic Congestion in Dhaka Metropolitan City শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, গবেষণায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ যাত্রী প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় যাতায়াতে ব্যয় করেন। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, যানজটের কারণে গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। গবেষণাটিতে যানজটের সামগ্রিক ব্যয় হিসাব করে একজন যাত্রীর জন্য দৈনিক চার মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষতির একটি প্রাক্কলনও দেওয়া হয়েছিল। এটি গবেষণার সময়কার হিসাব, বর্তমান সময়ের প্রত্যেক যাত্রীর জন্য নির্দিষ্ট ক্ষতির পরিমাণ নয়।

    এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যানজটে হারানো সময় কেবল ব্যক্তিগত অসুবিধা নয়, এটি উৎপাদনশীলতার ক্ষতিও। একজন কর্মী যদি প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক পরে কর্মস্থলে পৌঁছান, তাহলে তাঁর কাজের সূচি ব্যাহত হয়। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের উন্নয়নের জন্য পড়াশোনার সুযোগও কমে যায়।

    যানজটের আর্থিক ক্ষতিও বহুমুখী। গণপরিবহনে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পাশাপাশি অনেক যাত্রীকে বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করতে হয়। কখনো রিকশা, কখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশা, কখনো মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন তাঁরা। এতে দৈনিক যাতায়াতের ব্যয় বাড়ে। আবার যানজটে গাড়ির জ্বালানি অপচয় হয়, পরিবহন পরিচালনার খরচ বাড়ে এবং পণ্য পরিবহনে বিলম্ব ঘটে।

    বিশেষ করে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই ক্ষতি আরও গুরুতর। একজন দিনমজুর কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কাজের জায়গায় পৌঁছাতে বেশি সময় ব্যয় করলে তাঁর আয় করার সুযোগ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ যানজটের বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। যাঁদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে, তাঁরা কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প বেছে নিতে পারেন। কিন্তু যাঁরা বাস, রিকশা বা অন্যান্য গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের সময় ও ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেক কম।

    কর্মজীবী মানুষের দিনের শুরুতেই ক্ষতি

    কর্মজীবী মানুষের কাছে সময়মতো অফিসে পৌঁছানো শুধু দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়, চাকরির নিরাপত্তা ও পেশাগত মূল্যায়নের সঙ্গেও যুক্ত। যানজটের কারণে দেরি হলে কর্মীর ওপর নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। অথচ দেরির জন্য সব সময় কর্মীর ব্যক্তিগত অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা যায় না।

    যে শহরে যাতায়াতের সময় নির্ভরযোগ্য নয়, সেখানে কর্মীর পক্ষে প্রতিদিনের সময়সূচি পরিকল্পনা করা কঠিন। একদিন একই পথে এক ঘণ্টা লাগতে পারে, অন্যদিন লাগতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্য অতিরিক্ত সময় হাতে রাখতে হয়। এই বাড়তি সময় আসলে বিশ্রাম, পরিবারের সঙ্গে থাকা কিংবা ব্যক্তিগত কাজের সময় থেকে কেটে নেওয়া হয়।

    অফিস ছুটির পরও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। দিনের কাজ শেষে বাসায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগলে পরিবারকে সময় দেওয়া, সন্তানদের পড়াশোনায় সহায়তা করা কিংবা নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়। দীর্ঘ যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয় যানবাহনের শব্দ, গরম, ধুলা, ভিড় এবং অনিশ্চয়তা। এসব অভিজ্ঞতা মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে।

    প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি উদ্বেগের বিষয়। কর্মীদের নিয়মিত দেরি, ক্লান্তি এবং যাতায়াতজনিত চাপ কাজের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হলে ব্যবসার সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই যানজট নিরসন কেবল সড়ক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

    শিক্ষাজীবনেও যানজটের নেতিবাচক প্রভাব

    শিক্ষার্থীদের জন্য সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘ যানজটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে ক্লাস শুরুর অনেক আগে বাসা থেকে বের হতে হয়। তারপরও গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকে না।

    ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যানজটের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তিতা, মনোযোগ, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এবং সামগ্রিক জীবনমানের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি ৮২ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি। এতে যানজটের ঘনঘন অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাবের সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে নমুনার আকার সীমিত হওয়ায় ফলাফলকে ঢাকার সব শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

    শিক্ষার্থীদের সমস্যাটি কয়েকটি স্তরে কাজ করে। প্রথমত, যানজটের কারণে ক্লাসে পৌঁছাতে দেরি হলে পাঠের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, যাতায়াতের ক্লান্তি শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখাকে কঠিন করতে পারে। তৃতীয়ত, দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে বাড়িতে পড়াশোনা, দলগত কাজ, গ্রন্থাগার ব্যবহার কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সময় কমে যায়।

    পরীক্ষা, ব্যবহারিক ক্লাস কিংবা ভর্তি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যানজট আরও বড় উদ্বেগ তৈরি করে। যাতায়াতের অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের বাড়তি মানসিক চাপের মধ্যে রাখে। আবার অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যয়বহুল বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে যাতায়াতের অসুবিধা তাঁদের শিক্ষার সুযোগকেও প্রভাবিত করতে পারে।

    এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নগর পরিবহন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন, পর্যাপ্ত বাসসেবা এবং সময়সূচির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে যানবাহন ওঠানামার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা থাকতে হবে।

    গণপরিবহন দুর্বল হলে সড়কে চাপ বাড়ে

    যানজটের একটি বড় কারণ হলো শহরের বিপুল যাতায়াত চাহিদার সঙ্গে পরিবহনব্যবস্থার অসামঞ্জস্য। ঢাকা শহরের পরিবহন নিয়ে জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের ২০১৯ সালের মূল্যায়নে সাশ্রয়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ঢাকার পরিবহনব্যবস্থায় বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের মিশ্র চলাচল এবং সমন্বিত গণপরিবহনের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

    যখন গণপরিবহন পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও আরামদায়ক হয় না, তখন সামর্থ্যবান মানুষের একাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে। অন্যদিকে বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়মিত বিরতি এবং যাত্রী ওঠানামার বিশৃঙ্খলা যাতায়াতকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

    বাস কোথায় থামবে, কোথা থেকে যাত্রী তুলবে, কোথায় নামাবে এবং কত সময় পরপর চলবে, এসব বিষয়ে কার্যকর শৃঙ্খলা না থাকলে সড়কের ধারণক্ষমতা কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে একই সড়কে দ্রুতগতির যানবাহন, ধীরগতির যানবাহন এবং পথচারীর চলাচল একে অপরের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে। ফুটপাত দখল বা অকার্যকর হয়ে পড়লে মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটেন, যা নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ায় এবং যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

    গণপরিবহনের দুর্বলতার সমাধান শুধু বাসের সংখ্যা বাড়ানো নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত রুট, নির্ধারিত স্টপেজ, পর্যাপ্ত বাস, চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর তদারকি। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য তথ্যভিত্তিক সময়সূচি ও সহজে ব্যবহারযোগ্য টিকিটব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

    সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব

    যানজটের কারণ হিসেবে শুধু যানবাহনের সংখ্যা বাড়াকে দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। সড়কের ব্যবহার, নির্মাণকাজ, পার্কিং, ট্রাফিক সিগন্যাল, পথচারীর নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব পালনের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

    ঢাকা শহরের যানজট ও নগর পরিচালনা নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের The State of Cities 2016 প্রতিবেদনে পরিবহন ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব, সমন্বয় এবং নগর পরিবহন পরিচালনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। যদিও প্রতিবেদনটি পুরোনো, এর উত্থাপিত শাসন ও সমন্বয়সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো পরিবহন ব্যবস্থাপনা মূল্যায়নে এখনও প্রাসঙ্গিক।

    একটি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলে তার বিকল্প পথ, কাজের সময়সীমা এবং যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা আগে থেকে নির্ধারণ করা জরুরি। কিন্তু বিভিন্ন সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে একই সড়ক বারবার খোঁড়া হয়, নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হয় এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে।

    একইভাবে রাস্তার পাশে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, অনিয়ন্ত্রিত যাত্রী ওঠানামা, ফুটপাত দখল এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা না নিলে শুধু সিগন্যালে পুলিশ মোতায়েন করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।

    যানজট নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোন সংস্থা সড়ক নির্মাণ করবে, কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেখবে, কে গণপরিবহনের রুট ও মান নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে, এসব বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহি থাকতে হবে।

    যানজট কমাতে কী করা প্রয়োজন?

    প্রথমত, গণপরিবহনকে ব্যক্তিগত গাড়ির কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত বাস, নির্ভরযোগ্য সময়সূচি, সুশৃঙ্খল রুট এবং নিরাপদ যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বাস চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট লেন কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হলে যানজটে বাসের সময় নষ্ট হওয়া কমতে পারে এবং গণপরিবহনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে।

    দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেলসহ গণপরিবহনের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে সংযোগ উন্নত করতে হবে। একটি পরিবহনমাধ্যম থেকে অন্যটিতে সহজে যাতায়াত করা না গেলে যাত্রীদের পুরো পথ ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্য যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। মেট্রো স্টেশনের সঙ্গে বাস, হাঁটার পথ এবং নিরাপদ সংযোগব্যবস্থা তৈরি করা তাই গুরুত্বপূর্ণ।

    তৃতীয়ত, পথচারী ও সাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ছোট দূরত্বের যাত্রায় হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহারকে উৎসাহিত করা গেলে মোটরচালিত যানবাহনের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে এ জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত, সড়ক পারাপার নিরাপদ এবং হাঁটার পথ অবিচ্ছিন্ন রাখতে হবে।

    চতুর্থত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। সড়কের যানপ্রবাহ অনুযায়ী সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজের তথ্য প্রকাশ, যাত্রার সম্ভাব্য সময় জানানো এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা যানজট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়ম প্রয়োগ ও মাঠপর্যায়ের তদারকি অপরিহার্য।

    পঞ্চমত, নগর পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান, আবাসন ও পরিবহনের সম্পর্ক বিবেচনা করতে হবে। শহরের এক প্রান্তে আবাসন এবং অন্য প্রান্তে কর্মস্থল কেন্দ্রীভূত থাকলে প্রতিদিন দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতের প্রয়োজন বাড়ে। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসন ও নাগরিক সেবার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা গেলে দীর্ঘ যাত্রার চাপ কমানো সম্ভব।

    সময়ের মূল্য কে দেবে?

    যানজটে আটকে থাকা প্রতিটি মানুষের সময়ের মূল্য রয়েছে। একজন কর্মীর কাছে সেই সময় কর্মঘণ্টা, একজন শিক্ষার্থীর কাছে পড়াশোনার সুযোগ, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে আয় এবং একজন রোগীর কাছে চিকিৎসা পাওয়ার জরুরি মুহূর্ত। অথচ যানজটের ক্ষতি সাধারণত কোনো ব্যক্তির একক হিসাবে দৃশ্যমান হয় না। ক্ষতিটি ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক অর্থনীতির মধ্যে।

    যে শহরে মানুষকে প্রতিদিন গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অনিশ্চিত সময় হাতে রাখতে হয়, সেখানে কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। পরিবহনব্যবস্থার অদক্ষতার মূল্য দিতে হয় যাত্রীকে, অথচ সেই ব্যবস্থার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ সীমিত।

    এ কারণে যানজট নিরসনকে শুধু ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি নগর পরিচালনা, গণপরিবহন পরিকল্পনা, সড়ক অবকাঠামো, ভূমি ব্যবহার এবং নাগরিক সেবার সমন্বিত প্রশ্ন। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি।

    বাংলাদেশের বড় শহরগুলোকে আরও কার্যকর ও বাসযোগ্য করতে হলে সড়কে চলাচলের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের যাতায়াতকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে দ্রুত ও স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া, শুধু আরও বেশি যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা তৈরি করা নয়।

    React:

    Leave a Comment

    Your email address will not be published.

    Theme by Jhinai Technologies