Skip to content
November 8, 2026
দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, বিপন্ন জনজীবন
জনপদ

দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, বিপন্ন জনজীবন

In This Article

    রুমা আক্তার ।।

    একটি বাসযোগ্য নগরের প্রধান শর্ত হলো নির্মল বাতাস, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগরবাসী প্রতিদিন কর্মস্থলে যাবেন, শিশুরা স্কুলে যাবে, মানুষ পান করবে নিরাপদ পানি, আর বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক পথে নেমে যাবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে এই মৌলিক প্রত্যাশাগুলোই ক্রমে অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বাতাসে ধুলা ও ক্ষতিকর কণা, নালা ও খালে জমে থাকা বর্জ্য, সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে জলাবদ্ধতা এবং পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নগরজীবনের পরিচিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় পরিবেশদূষণের বহুমাত্রিক প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। তবে সমস্যাটি শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দ্রুত সম্প্রসারিত নগর এলাকাগুলোতেও বায়ুদূষণ, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানিদূষণের ঝুঁকি রয়েছে।

    বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের বাংলাদেশবিষয়ক পরিবেশ বিশ্লেষণে বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, দুর্বল স্যানিটেশন এবং সিসার সংস্পর্শকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এসব পরিবেশগত সমস্যার সঙ্গে প্রতিবছর অকালমৃত্যু ও বিপুলসংখ্যক অসুস্থতার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ পরিবেশদূষণ শুধু সৌন্দর্যহানির বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সূত্র: বিশ্বব্যাংক, Bangladesh Country Environmental Analysis 2023, প্রকাশিত ২০২৪ সালে।

    প্রশ্ন হলো, নগরায়ণ ও উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কেন এগোচ্ছে না? নগরবাসী কেন প্রতিদিন এমন পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে সুস্থ থাকার জন্যও বাড়তি সতর্কতা ও অর্থ ব্যয় করতে হয়?

    বায়ুদূষণ: নিঃশ্বাস নেওয়াও যখন ঝুঁকির

    শহরের ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বাতাসে ক্ষতিকর দূষক ছড়িয়ে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলার প্রকোপ বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সূক্ষ্ম বস্তুকণা বা পিএম ২.৫ ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

    শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বায়ুদূষণের কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে দূষিত বাতাস থেকে নিজেকে পুরোপুরি রক্ষা করার সুযোগ সবার নেই। একজন নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, ট্রাফিক পুলিশ কিংবা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে দীর্ঘ সময় খোলা পরিবেশে কাজ করতে হয়। ঘরের বাইরে কাজ না করলে তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে দূষণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ তাঁদের জন্য সব সময় বাস্তবসম্মত নয়।

    বাংলাদেশের জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০২৪ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ এবং পরিকল্পনায় শিল্প, যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য পোড়ানো ও অন্যান্য উৎসকে বায়ুদূষণের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সূত্র: পরিবেশ অধিদপ্তর, National Air Quality Management Plan 2024-2030।

    অতএব বায়ুদূষণ কমানোর দায়িত্ব শুধু নাগরিকের মাস্ক ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা, দূষণকারী শিল্পকারখানার ওপর কার্যকর নজরদারি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং নিয়মিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ম ভাঙলে জরিমানা করার পাশাপাশি পুনরায় অপরাধ ঠেকানোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

    অনিরাপদ পানি: জীবনরক্ষাকারী উপাদানেই বিপদ

    পানি ছাড়া জীবন চলে না। অথচ শহরে বসবাস করলেই যে প্রত্যেকে নিরাপদ পানীয় জল পাচ্ছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। পানি সরবরাহের উৎস, পাইপলাইনের অবস্থা, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং আশপাশের পরিবেশের ওপর পানির নিরাপত্তা নির্ভর করে। সরবরাহব্যবস্থায় ত্রুটি, দূষিত উৎসের পানি কিংবা সংরক্ষণের সময় জীবাণুর সংস্পর্শে আসার কারণে পানির মান নষ্ট হতে পারে।

    নগরবাসীর অনেকেই পানি ফুটিয়ে পান করেন, ফিল্টার ব্যবহার করেন অথবা বোতলজাত পানি কেনেন। কিন্তু এসব ব্যবস্থার জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন নিরাপদ পানি কেনা কিংবা উন্নত পরিশোধনব্যবস্থা ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে। ফলে নিরাপদ পানি পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্যের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

    পানির নিরাপত্তা যাচাই করতে শুধু স্বচ্ছতা বা গন্ধের ওপর নির্ভর করা যায় না। পানিতে ক্ষতিকর জীবাণু বা কিছু রাসায়নিক দূষক থাকলেও তা চোখে দেখা নাও যেতে পারে। তাই সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ এবং দূষণ শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

    বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশবিষয়ক পরিবেশ বিশ্লেষণে অনিরাপদ পানি, দুর্বল স্যানিটেশন এবং পানির উৎসে দূষণের বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য নদী ও জলাশয়ের পানির মান নষ্ট করে। এর ফলে পরিবেশের পাশাপাশি পানি ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীও ঝুঁকিতে পড়ে।

    এখানে ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট পানি সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির উৎস সংরক্ষণ, শোধনাগারের কার্যকারিতা, পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রাহক পর্যায়ে মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কোনো এলাকায় পানিদূষণের অভিযোগ উঠলে দ্রুত নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল জানাতে হবে। একই সঙ্গে দূষণের কারণ শনাক্ত করে তা দূর করতে হবে।

    নিরাপদ পানি নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন। এই প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব কোনোভাবেই শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

    জলাবদ্ধতা: বৃষ্টির পানি নামবে কোথায়?

    শহরে বৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বৃষ্টির পর সড়ক ডুবে যাওয়া, যান চলাচল ব্যাহত হওয়া, দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়া এবং নোংরা পানির মধ্যে মানুষকে চলাচল করতে বাধ্য হওয়া স্বাভাবিক নগরজীবনের অংশ হতে পারে না।

    জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাশয় ভরাট, নালা দখল, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং বর্জ্য জমে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া সমস্যাটিকে বাড়িয়ে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে, কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও জলাবদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

    জলাবদ্ধতা শুধু যানজটের সমস্যা নয়। জমে থাকা নোংরা পানির সংস্পর্শে এলে ত্বকের সমস্যা ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পানির সঙ্গে পয়োবর্জ্য মিশে গেলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, অসুস্থ মানুষের হাসপাতালে পৌঁছানো এবং শ্রমজীবী মানুষের কর্মস্থলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে, পণ্য নষ্ট হয় এবং দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের আর্থিক ক্ষতি বাড়ে।

    জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু বড় নালা নির্মাণ বা বর্ষার আগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। নগরের খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ, নিষ্কাশনপথের মানচিত্র তৈরি, নিয়মিত নালা পরিষ্কার এবং নির্মাণকাজের মান যাচাই করতে হবে। যেখানে পাম্প বা বিশেষ নিষ্কাশনব্যবস্থা প্রয়োজন, সেখানে তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

    এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। কোন নালা কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে, কোন খালের দায়িত্ব কার এবং কোথায় পানি আটকে যাচ্ছে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন না থাকলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে।

    বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শহরের আবর্জনা, সবার দায়

    প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, বাজারের আবর্জনা, নির্মাণবর্জ্য এবং বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে পরিবেশদূষণ বাড়ে। নালা ও খালে প্লাস্টিক জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ালে বাতাস দূষিত হয় এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলে রাখা আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ ও রোগবাহক পোকামাকড়ের বিস্তার ঘটতে পারে।

    বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা শুধু নাগরিকদের অসচেতনতার ফল নয়। পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাব, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ না হওয়া, বর্জ্য পরিবহনের দুর্বলতা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ আলাদা করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকাও এর সঙ্গে জড়িত।

    নাগরিকদের দায়িত্ব রয়েছে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা, যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলা এবং বর্জ্য আলাদা করার নিয়ম মেনে চলার। কিন্তু নাগরিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি করাও কর্তৃপক্ষের কাজ। আবর্জনা ফেলার জায়গা না থাকলে কিংবা নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য সংগ্রহ না হলে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

    বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঘর থেকেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ এবং প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। বিপজ্জনক চিকিৎসাবর্জ্য ও ইলেকট্রনিক বর্জ্যের জন্য আলাদা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্জ্য কোথায় ফেলা হচ্ছে তা নয়, শেষ পর্যন্ত কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা। এক জায়গা থেকে আবর্জনা সরিয়ে অন্য জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে ফেলে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং দূষণের স্থান বদলায়।

    দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ হোক

    পরিবেশদূষণের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার অন্যতম কারণ হলো দায়িত্বের বিভাজন ও সমন্বয়ের ঘাটতি। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক ও যানবাহন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পানি সরবরাহে ওয়াসা এবং বর্জ্য ও নগর পরিচ্ছন্নতায় সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা ভূমিকা পালন করে। জলাবদ্ধতা নিরসনেও একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে।

    কিন্তু নাগরিকের কাছে এসব সংস্থার পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো মুখ্য নয়। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাস্তায় ধুলা কমবে কি না, পানিতে দূষণ থাকবে কি না, বৃষ্টির পর পানি নামবে কি না এবং আবর্জনা নিয়মিত সরানো হবে কি না।

    তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থার কাজের পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কতগুলো দূষণকারী উৎসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, কত এলাকায় পানির নমুনা পরীক্ষা করা হলো, কতটি নালা পরিষ্কার করা হলো এবং কত সময়ের মধ্যে নাগরিক অভিযোগের নিষ্পত্তি হলো, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।

    সরকারি প্রকল্পের সাফল্য শুধু অর্থ ব্যয় বা অবকাঠামো নির্মাণের হিসাব দিয়ে বিচার করা যাবে না। বাস্তবে দূষণ কমেছে কি না, নাগরিক সেবা উন্নত হয়েছে কি না এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে কি না, সেগুলোই হতে হবে সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড।

    পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধিমালা থাকা জরুরি, তবে তার কার্যকর প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি নিয়ম ভাঙলেও ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত রূপান্তর পরিকল্পনা প্রয়োজন।

    সমাধান শুরু হোক সমন্বিত উদ্যোগে

    নগরের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য। বায়ুমানের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পানির পরীক্ষার ফল প্রকাশ, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকার মানচিত্র এবং বর্জ্য সংগ্রহের তথ্য নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে মানুষ সমস্যার কথা জানিয়ে তার অগ্রগতি অনুসরণ করতে পারেন।

    দ্বিতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। খাল, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। নতুন আবাসন বা শিল্পাঞ্চল তৈরির আগে পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

    তৃতীয়ত, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। দূষণের কারণে কোন এলাকায় কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় প্রয়োজন। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার এবং শ্রমজীবী মানুষের কর্মস্থলকে দূষণ নিয়ন্ত্রণের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখতে হবে।

    চতুর্থত, নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে যুক্ত করে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সমস্যার প্রকৃত চিত্র জানা সহজ হবে এবং সরকারি উদ্যোগের জবাবদিহিও বাড়বে।

    সবশেষে, পরিবেশ সুরক্ষাকে ব্যয় হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। দূষণ কমলে চিকিৎসার ব্যয় কমতে পারে, কর্মক্ষমতা বাড়তে পারে, নগরের উৎপাদনশীলতা উন্নত হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

    বাসযোগ্য নগর কোনো বিলাসিতা নয়

    একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা নতুন অবকাঠামোর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শহরের মানুষ কতটা নিরাপদে শ্বাস নিতে পারছেন, কতটা নিশ্চিন্তে পানি পান করছেন, বৃষ্টির পর কত দ্রুত স্বাভাবিক চলাচলে ফিরতে পারছেন এবং কতটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস করছেন, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

    দূষিত বাতাস, অনিরাপদ পানি, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সম্মিলিতভাবে নগরবাসীর স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জীবনমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা সাময়িক পরিচ্ছন্নতা অভিযান দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

    প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল প্রশাসন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, স্বচ্ছ তথ্য এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। উন্নয়নের প্রতিটি সিদ্ধান্তে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। দূষণকারীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং নাগরিকের নিরাপদ পানি, নির্মল বাতাস ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাওয়ার অধিকারকে বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

    মনে রাখতে হবে, পরিবেশের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষকেই বেশি ভোগায়। যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, যাঁদের নিরাপদ পানি কেনার সামর্থ্য সীমিত, যাঁদের বাসস্থান জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় এবং যাঁরা অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারেন না, তাঁদের জন্য দূষণের বোঝা আরও ভারী।

    React:

    Leave a Comment

    Your email address will not be published.

    Theme by Jhinai Technologies